সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রবীণ নাগরিকরা চরম সংকটে

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২১, ১০:১০ পিএম

জাতিসংঘের আহ্বানে ১৯৯১ সাল থেকে অক্টোবরের প্রথম দিনটিকে সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। প্রতি বছর দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ডিজিটাল সমতা সকল বয়সের প্রাপ্যতা’। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রাক্কালে সব বয়স-শ্রেণির জনগণের জন্য ডিজিটাল সমতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও আমাদের দেশে প্রবীণ নাগরিকের জন্য, বিশেষত দরিদ্র ও নিরক্ষর প্রবীণদের জন্য ‘ডিজিটাল সমতা’ এখনো কথার কথা হয়েই রয়েছে। এ জন্য আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

বার্ধক্য মানুষের জীবনে এক অনিবার্য বাস্তবতা। মৃত্যু যেমন অনিবার্য, তেমনি বেঁচে থাকলে প্রত্যেক মানুষকেই বার্ধক্যের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটির মতো প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে আনুমানিক ১-২ শতাংশ পেনশন সুবিধা ভোগ করে থাকেন। বাকিরা বেঁচে থাকার জন্য হয় নিজস্ব সম্পদ ও সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল নতুবা সন্তানরাই তাদের একমাত্র ভরসা। দেশে খুব কমসংখ্যক প্রবীণই রয়েছেন, যারা নিজের সম্পদ বা সঞ্চয় দিয়ে চলতে পারার মতো সৌভাগ্যবান। বিআইডিএস-এর এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রামবাংলায় দুই-তৃতীয়াংশের মতো প্রবীণ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন, যাদের নিজস্ব সহায়-সম্বল বলে তেমন কিছুই নেই।

বর্তমান করোনা মহামারীর দুঃসময়ে দেশের প্রবীণ নাগরিকরা জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। সন্তানদের নিজেদের জীবন-জীবিকাই যেখানে টালমাটাল এবং সীমাহীন অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন, তখন ইচ্ছা থাকলেও দিশেহারা সন্তানেরা প্রবীণ পিতা-মাতার দায়িত্ব কতটা বহন করতে পারছে বা পারবে, তাতে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে তো এই চ্যালেঞ্জের মাত্রা চরম। তাদের জন্য বেঁচে থাকাটা রীতিমতো ‘অভিশাপ’ হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারীর প্রভাবে সমস্ত বয়স্ক নাগরিক আজ অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানসিক ইত্যাদি বহুমাত্রিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। দেশে বয়স্কদের অধিকাংশই অসংক্রামক রোগে ভুগছেন। আইসিডিডিআর-বি’র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের চারজনই ভুগছেন এ ধরনের রোগে। সে হিসাবে দেশে ৮০ শতাংশ প্রবীণই (৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব) উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ডিমেনশিয়া (নিদ্রাহীনতা) এবং বিষণœতার মতো অসংক্রামক রোগের শিকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর এক গবেষণা বলছে, দেশে যত প্রবীণ রয়েছেন তার এক-চতুর্থাংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। আরও সহজভাবে বললে প্রতি ১০০ জন প্রবীণের মধ্যে পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন ২৫ জন। আর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবীণ। বার্ধক্যজনিত কারণে বয়স্কদের শরীর কমজোরি হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কও আর আগের মতো সচল থাকে না। এর ফলে, তারা পরিপার্শ্ব থেকে এমনিতেই কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বেঁচে থাকবার জন্য অন্য কারও সাহায্য ছাড়া তাদের এক মুহূর্তও চলে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে এখন বার্ধক্যও অনেক প্রলম্বিত। স্বাভাবিক ভাবেই, অসুখ-বিসুখের আশঙ্কাও বেশি। নিয়মমাফিক ডাক্তার দেখানো, ওষুধপত্রের জোগাড় রাখা জরুরি। যাদের সন্তানসন্ততি প্রবাসী, সেই সব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের তো বাইরের লোকের ওপর ভরসা করেই দিনাতিপাত করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তেমন সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ একেবারেই কম।

কাউকে ফেলে রেখে নয়, বরঞ্চ সবাইকে নিয়ে বিশ্বসমাজের প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির অভিযাত্রা চলমান রাখতে হবে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দলিলের মাহাত্ম্যই এখানে। বয়সের বিবেচনায়, আমাদের সমাজগুলো প্রধানত তরুণ-যুব-কর্মক্ষম জন-অংশের অনুকূলেই থাকে। তারুণ্য আর যুবশক্তির জয়গান গাওয়াই যেন সমাজের রীতি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বসংসারের সব সুবিধা এবং আয়োজন কেবল এদেরকেই ঘিরে। শিশু সুরক্ষার বিষয়টি নানাভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলেও প্রবীণদের কথা সমাজের কেউ খুব একটা বলেন না। অথচ সমগ্র বিশ্বে ষাটোর্ধ্ব নাগরিকরা জনসংখ্যার দ্রুত বর্ধনশীল অংশ। বাংলাদেশেও প্রবীণ জনসংখ্যার পরিমাণ বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। সর্বশেষ জনশুমারি-২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ প্রবীণ ছিল যা ২০৪১ সালে দ্বিগুণ হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রবীণদের কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাস করেন। তারা নিরক্ষর এবং অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল। কালের নিয়মেই তাদের উপার্জনক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তাদের অনেকেই পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকায় দৈনন্দিন গ্রাসাচ্ছাদন, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক চাহিদাগুলোর ক্ষেত্রেও চরম দুর্ভোগের শিকার হন। যারা সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে তাদের সমস্যা আবার অন্যরকম। ষাট ছুঁইছুঁই হতেই মনে গুনগুনিয়ে ওঠে কবীর সুমন, ‘বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয় মাঝে মাঝে একলা লাগে।’ শারীরিক অবনতি, মানসিক স্থিতিশীলতা হ্রাস কখনো বা প্রিয়জন বিয়োগ, বর্তমান নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির নতুন ধারায় সন্তান-নাতি-নাতনির সঙ্গসুখ থেকে বঞ্চিত হওয়া ইত্যাদি নানাবিধ কারণে তারা বড় নিঃসঙ্গ। এমতাবস্থায় করোনা হলো গোদের উপর বিষফোঁড়া। করোনাভাইরাস সমগ্র বিশ্বজুড়ে প্রবীণ নাগরিকদের বেঁচে থাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এই জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর হার যেমন বয়স্কদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি তেমনই ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে ঘরবন্দি অবস্থায়, দুশ্চিন্তা আর মৃত্যুভয়ে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা বোধহয় আরও বিপজ্জনক। প্রবীণদের অনেকেই স্মার্ট ফোনের ব্যবহার এখনো তেমন রপ্ত করতে পারেননি। ফলে তাদের নিজস্ব বন্ধুমহল থেকে তারা দূরে সরে গিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে নিঃসঙ্গতা মানসিক উদ্বেগ এবং হতাশা বাড়ায়। সামাজিক দূরত্বের এই নতুন অনুশীলনের ফলে বাড়ছে হৃদরোগের আশঙ্কা, ডিমেনশিয়ার প্রকোপ এবং অন্যান্য স্নায়বিক ব্যাধি।

শেষ বয়সের দেখভালে আমরা সন্তানের আবেগপূর্ণ মমতা আর পারিবারিক সেবাযত্ন আশা করে চলেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পরিবার পরিকল্পনার কল্যাণে বর্তমানে আমাদের সন্তানসন্ততির সংখ্যা ১/২-এ নেমে এসেছে। পাশাপাশি, বিশ্বময় অভিবাসন, নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থান ইত্যাদির সুযোগ অবারিত হওয়ার কারণে সন্তানরা এখন মাতাপিতাকে একাকী রেখে দূরে, বহু দূরে চলে যাচ্ছে। আবার, সচ্ছল প্রবীণ বা বয়োবৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে স্বতন্ত্র বাড়িতে একাকী বসবাস করার মতো আয়োজন, নিরাপত্তা ও প্রচলন আমাদের দেশ-সমাজ-সংস্কৃতিতে এখনো গড়ে ওঠেনি। বার্ধক্য স্বস্তিময় করতে হলে প্রবীণ নাগরিকের জন্য প্রয়োজন পেশাদারি চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা, উপযোগী খাদ্য, ওষুধ, পথ্য, শয্যা, বিনোদন, নিরাপত্তা, সমবয়সীদের সরব উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে উপযুক্ত সবকিছু নিজ বাড়িতে বসে পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ, নিজেদের বাসাবাড়িতে প্রবীণ পিতামাতার দেখভালের জন্য সন্তানসন্ততির সংখ্যা বা উপস্থিতি খুবই কম, সেবাদানকারী মানুষ জোগাড় করাও দুরূহ আর পেশাদার ডাক্তার-নার্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে নারী, সংসারহীন, সন্তানহীন, একা, গ্রামীণ ও হতদরিদ্র প্রবীণদের নিরাপদ বসবাস এবং মৌলিক চাহিদার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। বয়স্ক ভাতার আওতায় বর্তমানে একজন প্রবীণ সরকারিভাবে মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পেয়ে থাকেন। বাজারমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা মূল্য এবং চলমান দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে এই পরিমাণ টাকা একজন সহায়-সম্বলহীন প্রবীণের জীবন ধারণের জন্য কিছুই না। এই অপর্যাপ্ত ভাতাকে অর্থবহ করা যদিও সময়ের দাবি, দুর্যোগকালে ভাতার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়। আসলে প্রবীণদের ব্যাপারে আমাদের সমাজ এখনো খুব একটা সংবেদনশীল নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবীণদের নিয়ে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। সে জন্য প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাকে তাদের দোরগোড়ায় নেওয়া উচিত এবং সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রবীণ নিবাস হচ্ছে সবচেয়ে ভালো বিকল্প, যেখানে প্রতিজন প্রবীণ ব্যক্তির খাদ্য ও পুষ্টি, পেশাগত চিকিৎসা-পরিচর্যা, সাহচর্য, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ ইত্যাদি হাতের নাগালে থাকে। বিশেষ করে অতি বার্ধক্য মুহূর্তে (৮০ বছরের ওপরে, মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতায় বা চরমভাবে বিছানায় পড়ে গেলে) দরকারি চাহিদা পূরণের ন্যূনতম নিশ্চয়তার ব্যবস্থা থাকে। কেবল ভাববাদী, আবেগনির্ভর বা লোক দেখানোর জন্য নয়, বরঞ্চ বিচক্ষণ ও দূরদর্শী হয়ে সন্তানসন্ততি ও নাতি-নাতনি পরিবেষ্টিত পরিবারে বসবাসের সুযোগের পাশাপাশি আমাদের দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানসম্পন্ন প্রবীণনিবাস ও প্রবীণ সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারটি গভীরভাবে ভাবতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও এসব গড়ে তুলতে হবে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত