জামানতের টাকা নিয়ে ঘুমাচ্ছে জাগৃক

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ০২:১৪ এএম

পুলিশ কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) রাজধানীর মিরপুরের স্বপ্ন নগর আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করেন। বিধিমতে আবেদন করার পর ১ হাজার ৫৪৫ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য জাগৃক কর্তৃপক্ষের কাছে জামানত হিসেবে ২ লাখ ৫০ টাকার পে-অর্ডার জমা দেন। ফ্ল্যাটের চেয়ে আবেদনকারী বেশি হওয়ায় লটারি হয়। সেই লটারিতে ভাগ্য পক্ষে না থাকায় স্বপ্নের ফ্ল্যাট আর পাওয়া হয়নি তার। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এখন জামানতের টাকা ফেরত পেতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে। গত প্রায় ছয় মাস ধরে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেও জামানতের টাকা তুলতে পারেননি তিনি।

ক্ষুব্ধ সাইদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর সরকারি চাকরি করে শেষ সময়ে এসে ভেবেছিলাম একটি সরকারি ফ্ল্যাট পেলে চিন্তামুক্ত থাকব। সেখানে আবেদন করে আড়াই লাখ টাকাও জমা দিয়েছি। কিন্তু লটারিতে নাকি আমার নাম আসেনি। জমানতের টাকা তুলতে গত ৫/৬ মাস ধরে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছি। অফিস থেকে বলা হচ্ছে তাদের কাছে ফান্ড নেই। নিয়ম অনুযায়ী লটারি চূড়ান্ত হওয়ার আগে আমাদের জামানতের টাকায় হাত দেওয়ার কথা না। কিন্তু এখন তারা নানা অজুহাতে মাসের পর মাস টাকার জন্য ঘুরাচ্ছে।’

একই অবস্থা বাবলু নামের এক ব্যবসায়ীর। প্রায় ৫ বছর আগে ছয় লাখ টাকা জামানত দিয়ে জাগৃকের ধানমন্ডি এলাকার প্রকল্পে আবেদন করেছেন। কিন্তু তিন বছর মেয়াদি ওই প্রকল্পের কাজে এখনো পর্যন্ত হাতই দিতে পারেনি সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের জমি নিয়ে মামলা থাকায় কাজে বিলম্ব হচ্ছে। একই চিত্র চলতি বছর হাতে নেওয়া মোহাম্মদপুরের দোলনচাঁপা ও কনকচাঁপা প্রকল্পেরও। সেখানেও জমি হাতে না পেয়ে শুধু প্রসপেক্টাস বিক্রি করেই প্রায় এক হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা করে প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। বাস্তবে এ প্রকল্পের জমি হাতে নেই সংস্থাটির। এরইমধ্যে প্রকল্প এলাকার জমির দখলে থাকা লোকজন মামলা করে উচ্চ আদালত থেকে স্থিতাবস্থা নিয়ে এসেছে। ফলে এ প্রকল্প কবে শুরু হবে কেউ তা বলতে পারছেন না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জাগৃকের চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত স্বপ্ন নগর প্রকল্পে যারা আবেদন করেছেন কিন্তু ফ্ল্যাট পাননি, তাদের জামানতের টাকা আমাদের রাখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এ টাকা ব্যাংকে রাখার ফলে সেখান থেকে আবার তা এনে গ্রাহকদের মধ্যে দিতে গিয়ে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হচ্ছে তা অস্বীকার করব না। আর কিছু প্রকল্পে জামানতের টাকা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা নির্ধারিত সময়ে লটারি করা বা কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। আমরা তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বেদখল হওয়া জমি হাতে পাওয়ার আগে সেখানে দরপত্র আহ্বান করা হবে না। এমনকি লটারিও করব না। আর যেগুলোতে সমস্যা আছে তা সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

জাগৃক থেকে পাওয়া তথ্যমতে, রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। তিনটি ক্যাটাগরিতে সেখান থেকে ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা জামানত আসে জাগৃকের কোষাগারে। কিন্তু তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজে এখনো পর্যন্ত হাতই দিতে পারেনি সংস্থাটি। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, যে দশটি প্লটে ফ্ল্যাট করার কথা এর একটি ছাড়া বাকি নয়টি অন্যদের দখলে। এ নয়টির মধ্যে ইতিমধ্যে একটি প্লট প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে যারা ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছেন তারা জানান, গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাটাগরিভেদে তিন লাখ, চার লাখ ও ছয় লাখ টাকা করে জামানত হিসেবে আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা নিয়েছে জাগৃক। গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যাংকে রেখে জাগৃক কর্র্তৃপক্ষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলেও প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে কবে তা বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ধানমণ্ডি ও মোহাম্মদপুরের ‘গৃহায়ন ধানমণ্ডি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ’ প্রকল্পে যে দশটি প্লটে কাজ শুরু করার কথা তা হলো ধানমণ্ডির ১ নম্বর সড়কের ১৩৯/এ (নতুন ২৯), ২০ নম্বর সড়কের (নতুন ১০/এ) ১৮০/এ (নতুন ৫৩), ১২ নম্বর সড়কের (নতুন ৬/এ) ৫৪০/বি (নতুন ৩৮/বি), ২ নম্বর সড়কের ১৩৯ (নতুন ৩০), ১২/এ নম্বর সড়কের ২৫২ (নতুন ৭১), মোহাম্মদপুরের আসাদ এভিনিউয়ের ই ব্লকের ৩৮/সি এবং ৩৯/সি, ইকবাল রোডের এ ব্লকের ১২/৩ নম্বর প্লট। এসব প্লটে প্রস্তাবিত ভবনের একেকটি ফ্ল্যাটের আয়তন সর্বনিম্ন ১২০০ বর্গফুট থেকে সর্বোচ্চ ২৫০০ বর্গফুট নির্ধারণ করা হয়। সবমিলিয়ে এ প্রকল্পে মোট ২৫৩টি ফ্ল্যাট তৈরি করার কথা রয়েছে। সেখানে এ ক্যাটাগরিতে ১২৩টি ফ্ল্যাটের বিপরীতে ৩২২টি, বি ক্যাটাগরির ৫২টির বিপরীতে ২১৪টি এবং সি ক্যাটাগরির ২৭টির বিপরীতে ২৯৬টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। এ ক্যাটাগরির ফ্ল্যাটের জন্য ছয় লাখ টাকা, বি ক্যাটাগরির জন্য চার লাখ এবং সি ক্যাটাগরির জন্য তিন লাখ টাকা জমা দিয়ে আবেদন করেন গ্রাহকরা।

প্রকল্পটির অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা জাগৃকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু হোরায়রা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শুরুতে ১০টি প্লটে প্রকল্প শুরু করলেও পরে তা কমিয়ে ৬টি করা হয়েছে। এরমধ্যে আমরা ২টি প্লট হাতে পেয়েছি। আর বাকি ৪টি প্লট নিয়ে মামলা সংক্রান্ত জটিলতা আছে। আমরা চেষ্টা করছি এসব জটিলতা কাটিয়ে উঠতে।’

জাগৃক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ‘গৃহায়ন দোলনচাঁপা’ ও ‘গৃহায়ন কনকচাঁপা’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয় জাগৃক কর্র্তৃপক্ষ। সেখানে ৪৩০টি ফ্ল্যাটের বিপরীতে ৯৪৬টি আবেদন জমা পড়ে। ১৪৯০ বর্গফুট থেকে শুরু করে ১৮৫০ বর্গফুট আয়তনের দুটি ক্যাটাগরিতেই প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য জামানত হিসেবে ৩ লাখ টাকা করে জমা নেওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে এখান থেকে ২৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা জাগৃকের কোষাগারে জমা হয়েছে। প্রায় ৩ একর জমিতে হাতে নেওয়া এ প্রকল্পেও ইতিমধ্যে মামলা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে। মামলায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের অনুকূলে উচ্চ আদালত স্থিতাবস্থাও দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আবেদনকারীদের মধ্যে লটারি করা অথবা প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান এর কোনোটাই করতে পারছে না জাগৃক। ফলে এ প্রকল্পটিও অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাগৃকের মোহাম্মদপুর ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দোলনচাঁপা ও কনকচাঁপা নামের দুটি আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পে প্রায় সাড়ে নয়শ’ আবেদন পাওয়া গেছে। সেখানে আমরা জামানত হিসেবে টাকাও পেয়েছি। এখন কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় যারা বসবাস করছেন তাদের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় উচ্চ আদালত স্থিতাবস্থা দিয়েছে। ফলে আমরা এখনই কাজ শুরু করতে পারছি না। আর অন্যসব দাপ্তরিক প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে।’

মিরপুরের স্বপ্ন নগরে দুটি প্রকল্পে মোট ৩১২টি ফ্ল্যাটের বিপরীতে আবেদন আহ্বান করে জাগৃক। সেখানে ফ্ল্যাটের চেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়ায় লটারি করে সংস্থাটি। নিয়ম অনুযায়ী লটারিতে ফ্ল্যাট না পাওয়া গ্রাহকদের টাকা সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু ৫/৬ মাস পার হলেও গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাগৃকের ঢাকা ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জোয়ার্দার তাবেদুন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের লটারি শেষ হওয়ার পর যারা ফ্ল্যাট পাননি তাদের জামানতের টাকা দ্রুত সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এখনো তাদের টাকা ফেরত দিতে পারিনি। এ টাকাগুলো চেয়ারম্যান মহোদয়ের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। সেখান থেকে টাকা ফেরত আনার জন্য আমি চিঠি লিখেছি। এখনো আসেনি। সব মিলিয়ে এ টাকার পরিমাণ চার কোটি টাকার বেশি হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত