করোনার টিকাদানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশ ভালো। বিশেষ করে সম্পূর্ণ বা দুই ডোজ টিকার ক্ষেত্রে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশকে টপকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ওপরে উঠে এসেছে। সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা বিবেচনায় বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ ১১ নম্বরে রয়েছে। বাংলাদেশ গত রবিবার পর্যন্ত মোট যে পরিমাণ মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে পেরেছে, সেখানে এর বেশি পরিমাণ মানুষকে টিকা দিতে পেরেছে মাত্র ১০টি দেশ।
এমনকি দুই ডোজ টিকার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও ওপরে, তিন নম্বরে। বাংলাদেশের চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে দুই ডোজ টিকা দিয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। আর এশিয়ার ৪৪টি দেশের মধ্যে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় নম্বর। টিকার বৈশ্বিক ওয়েবসাইট আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা বা ওডব্লিউআইডির সর্বশেষ গতকাল সোমবার এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত রবিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে বৈশ্বিক টিকাদানের এমন তুলনামূলক চিত্র পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যেসব দেশের তুলনা করা হয়, যেমন মালদ্বীপ, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল, এদের মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে কম। আমরা আজকেও (গতকাল) প্রথম, দ্বিতীয় ও বুস্টার ডোজ মিলে ১৫ লাখের বেশি টিকা দিয়েছি। ভুটানের জনসংখ্যাই তো সাত লাখ। এসব দেশের যে জনসংখ্যা, সেটা আমরা দুদিনেই দিয়ে দিতে পারি। সব মিলে আমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ, আমাদের লক্ষ্যমাত্রার জনসংখ্যার শতকরা হিসাব, আমরা অত্যন্ত ভালো অবস্থানেই আছি। ৭ কোটি ১৪ লাখ ৭৫ হাজার (গতকাল পর্যন্ত) দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। এটা অনেক। ফেব্রুয়ারিতে যে লক্ষ্য, আরও যদি এক থেকে দেড় কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পারি, তাহলে যে ৭০ শতাংশ জনসংখ্যাকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, সেটা পার হয়ে যাবে। প্রথম ডোজ টিকা দিতে পারলে দ্বিতীয় ডোজ এমনিতেই হয়ে যাবে। এজন্য আমরা প্রথম ডোজের প্রচারণা ব্যাপকভাবে করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা টার্গেট পপুলেশনের ৮৫ শতাংশকে প্রথম ডোজ টিকা দিয়েছি, ৫৯ শতাংশের বেশি জনসংখ্যাকে দ্বিতীয় ডোজ দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘যেভাবে টিকা দেওয়া হচ্ছে, তাতে আগামী মার্চের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় ডোজ ১০ কোটি অতিক্রম হয়ে যাবে। সে হিসাবে টার্গেট পপুলেশনের ৮৫ শতাংশকে টিকা দেওয়া শেষ হবে। এর মধ্যে আরও এক কোটি ডোজ হবে প্রথম ডোজের। এরা এপ্রিলে দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে নেবে। টার্গেট পপুলেশন শেষ হয়ে যাবে।’
বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ টিকার আওতায় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৭ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সরকার। সংস্থার পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। সে অনুযায়ী এখন দেশের ১১ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ জনকে করোনার টিকা দেবে সরকার।
সর্বশেষ গত রবিবারের তথ্য অনুযায়ী, সরকার প্রথম ডোজ টিকা দিয়েছে ১০ কোটি ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৪১২ জনকে। সে হিসাবে এখন পর্যন্ত টিকার আওতায় এসেছে মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ ও লক্ষ্যমাত্রার ৮৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ মানুষ।
সরকার গত রবিবার পর্যন্ত সম্পূর্ণ বা দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিয়েছে ৭ কোটি ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৪৬ জনকে। সে হিসাবে সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে মোট জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ ও লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ শতাংশ মানুষ। এখন পর্যন্ত দেশে বুস্টার বা তৃতীয় ডোজ টিকা পেয়েছে ২৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৫ জন। এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৫২ শতাংশ ও লক্ষ্যমাত্রার ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
বৈশ্বিক তালিকায় ১১ নম্বরে বাংলাদেশ : ওডব্লিউআইডির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে গত রবিবার পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ মানুষ সম্পূর্ণ বা দুই ডোজ টিকা পেয়েছে। সংখ্যার হিসাবে বিশ্বে সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে ৪২৫ কোটি মানুষ এবং ১ হাজার ৪০ কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে।
ওডব্লিউআইডির তালিকায় থাকা ২২০টি দেশের টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোনো দেশ তাদের মোট কত মানুষকে সম্পূর্ণ বা দুই ডোজ টিকা দিয়েছে সে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১১ নম্বরে। বাংলাদেশ দিয়েছে ৭০ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষকে। বাংলাদেশের নিচে রয়েছে জার্মানি। সেখানে সম্পূর্ণ টিকা দেওয়া হয়েছে ৬২ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষকে। এ তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ভারত ও পাকিস্তান।
সম্পূর্ণ টিকার শীর্ষে থাকা ১০ দেশের শীর্ষে রয়েছে চীন। সেখানে সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন বা ১২৩ কোটি মানুষ। তালিকার শীর্ষ আর নয়টি দেশের মধ্যে ভারতে সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে ৭৫০ মিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রে ২১৩ মিলিয়ন, ব্রাজিলে ১৫২ মিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৩৫ মিলিয়ন, জাপানে ১০০ মিলিয়ন, পাকিস্তানে ৮৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন, মেক্সিকোতে ৭৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন, ভিয়েতনামে ৭১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ও রাশিয়ায় ৭০ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ৩ নম্বরে বাংলাদেশ : দক্ষিণ এশিয়ার করোনার টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখানকার সাত দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পূর্ণ বা দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিয়েছে ভারত, ৭৪৮ মিলিয়ন মানুষকে। এরপর রয়েছে পাকিস্তান ৮৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষকে। এরপরই বাংলাদেশের অবস্থান। এখানে সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে ৭০ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ। এরপর নেপালে ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন, শ্রীলঙ্কায় ১৪ মিলিয়ন, ভুটানে ৫ লাখ ৭১ হাজার ও সর্বনিচে মালদ্বীপে ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষ দুই ডোজ বা সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে।
এশিয়ায় বাংলাদেশ ৬ নম্বরে : এশিয়ার ৪৪ দেশের টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখানে সম্পূর্ণ টিকা পাওয়া দেশের তালিকায় ছয় নম্বরে বাংলাদেশ। এ অঞ্চলে সম্পূর্ণ টিকা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে চীন, ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন বা ১২৩ কোটি ও দ্বিতীয় অবস্থানে ভারতে ৭৫ কোটি মানুষ। এরপর সর্বোচ্চসংখ্যক সম্পূর্ণ টিকার তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে ইন্দোনেশিয়া ১৩৫ মিলিয়ন বা ১৩ কোটি ৫ লাখ, জাপান ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ও পাকিস্তান ৮৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন বা ৮ কোটি ৯৯ লাখ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দিয়েছে। বাংলাদেশের নিচে ভিয়েতনাম ৭১ দশমিক ৯ মিলিয়ন বা ৭ কোটি ১৯ লাখ, ফিলিপাইন ৬০ দশমিক ১ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ১ লাখ, ইরান ৫৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ৪৮ লাখ ও তুরস্ক ৫২ দশমিক ৬ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ২৬ লাখ মানুষকে সম্পূর্ণ টিকা দিয়েছে।
