যুদ্ধকৌশলে হাসপাতালে হামলা

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২২, ১১:১০ পিএম

প্রতিপক্ষের সামরিক লক্ষ্যবস্তু, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা কিংবা যোগাযোগ অবকাঠামোতে হামলা চালানো যুদ্ধের আদি এবং প্রচলিত কৌশল। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জেনেভা কনভেনশন হওয়ার পর থেকে যুদ্ধকালে প্রতিপক্ষের আহত, অসুস্থ বা বন্দি যোদ্ধাদের সঙ্গে আচরণ, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা কিংবা ধর্ম ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিয়োজিত কর্মীদের ওপর হামলা না হওয়া নিশ্চিত করতে সচেতন থাকতে হয়। কনভেনশনবিরুদ্ধ কোনো কাজ হলে তা যুদ্ধাপরাধ হয়ে যায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ওই কনভেনশন হওয়ার পর থেকে যতগুলো বড় যুদ্ধ বা সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে তার কোনোটিতেই চুক্তি ও প্রটোকলের সবগুলো মানা হয়নি। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে ইউক্রেনের হাসপাতালকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার বিষয়টি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, হাসপাতালে হামলা দিন দিন যুদ্ধের কৌশল হয়ে উঠছে; যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।

গত সপ্তাহে ইউক্রেনের মারিওপোলের এক হাসপাতালে হামলা চালায় রাশিয়া। মা ও শিশুদের ওই হাসপাতালটিতে হামলার পরপরই বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ওই হামলার প্রতিবাদ জানায় জাতিসংঘ। সংস্থাটির মুখপাত্র স্টিফানে ডুজারিখ বলেন, যেসব ভবনে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অবস্থান করছেন, সেসব ভবনে কখনোই হামলা চালানো উচিত নয়। তখন তিনি জানান, জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিগগিরই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এ ধরনের হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা যাতে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না হন, সে আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি। যদিও রাশিয়ার তরফ থেকে দাবি করা হয়, হাসপাতাল বলে দাবি করা ভবনটিতে আসলে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলছিল না। সেখানে সামরিক কর্মকাণ্ড চলছে এমন প্রমাণসাপেক্ষেই তারা হামলা চালিয়েছে।

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মাইকোলাইভের একটি ক্যানসার হাসপাতালও রাশিয়ার ছোড়া গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে কোনো নিহতের ঘটনা না ঘটলে কেমোথেরাপির রোগীসহ জটিল রোগীদের স্থানান্তর করতে হয়েছে। তাতে রোগীদের ঝুঁকি বেড়েছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি হাসপাতাল দখলে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া মারিওপোলে বিভিন্ন ভবনে আটকে আছেন হাজারও মানুষ। তাদের খাদ্যের পাশাপাশি দরকার হয়ে পড়েছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার। সংক্রমণের কারণে অনেকের শরীরে পচন ধরেছে। কিন্তু কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ইউক্রেনে হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবাসংশ্লিষ্ট অন্তত ৪৩টি স্থানে হামলার বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পেরেছে। এ সময়ে বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতস্থলে আরও ৪৬টি এমন ঘটনা ঘটেছে। অথচ জেনেভা কনভেনশনে এমন হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের নির্বাহী পরিচালক ডা. মাইক রায়ান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ইউক্রেনসহ অন্যান্য যেসব সংঘাতপূর্ণ এলাকায় হাসপাতাল ও জনস্বাস্থ্য খাত যেভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে তাতে মনে হয় এটা যুদ্ধের নতুন কৌশল হয়ে উঠতে যাচ্ছে। যা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ইউক্রেনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কোনোমতে টিকে আছে। খাতটিকে এখন সহায়তা করার সময়। মানুষের জীবন বাঁচানোর একান্ত কিছু সরঞ্জামাদি দরকার। কিন্তু উল্টো হামলা হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে। ইউক্রেনের মতো আফগানিস্তান, বুরকিনা ফাসো, কঙ্গো, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিস্তিন, সুদান এবং সিরিয়ায়ও একই ঘটনা ঘটছে। প্রতিপক্ষের মৌলিক বিষয়গুলোতে আঘাত হানা হচ্ছে; যা যুদ্ধাপরাধ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত