আ.লীগ পরিবারের শ্রাবণেই আস্থা বিএনপির

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২২, ০৬:৪২ এএম

দলের প্রতি আনুগত্য ও দলের হাইকমান্ডের আস্থা অর্জন করায় আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারের সদস্য হওয়ার পরেও কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তারা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে শ্রাবণের ওপর যে দায়িত্ব ছিল তা তিনি যথাযথ পালন করায় তাকে ছাত্রদলে সভাপতি হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই কারণে সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

যশোরের কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী রফিকুল ইসলামের ছেলে কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে ছাত্রদল সভাপতি নির্বাচিত করায় আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই বিএনপির নেতাদের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এলো।

আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান হওয়ার পরও শ্রাবণকে ছাত্রদল সভাপতি করার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি যে একটা উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি। দীর্ঘদিন ধরেই শ্রাবণ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সে নিজেকের একজন যোগ্য নেতা হিসেবে দলের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কাছে তুলে ধরতে পেরেছেন। শ্রাবণ যে দলে কতটা জনপ্রিয় তা প্রমাণ হয়েছে কমিটি ঘোষণার পর। রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার পক্ষে আনন্দ মিছিল করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।’

সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাজী আসাদকে আহ্বায়ক করে ছাত্রদলের আহ্বায়ক করেছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার গ্রামের বাড়ি ছিল গোপালগঞ্জ। সে সময় কাজী আসাদ একটি হলের ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। সব জেনেশুনে বিচার-বিবেচনা করে তাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে থেকে প্রমাণ করেছিলেন যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাছাই যথার্থ ছিল। অনেক প্রলোভন থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘শ্রাবণের বাবা আওয়ামী লীগ, এক ভাই ছাত্রলীগ, অপর ভাই যুবলীগের সাবেক নেতা। এ অবস্থায় শ্রাবণ ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার পর থেকে সভাপতি হওয়ার আগ পর্যন্ত দলের হাইকমান্ডের আস্থা অর্জন করায় তাকেই সভাপতি হিসেবে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান।’  

পরিবারের সদস্যরা বলছেন শ্রাবণ মনেপ্রাণে ছাত্রদলের সঙ্গে জড়িত ও নেতা। শ্রাবণের বড় ভাই মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, শ্রাবণ ছাত্রদল নেতা হওয়ায় সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমার বাবা কাজী রফিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। এজন্য তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। আমরা পাঁচ ভাই ও এক বোন। সবার ছোট শ্রাবণ। মেধাবী ছাত্র। ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত।

যে কারণে শ্রাবণকে বেছে নিলেন তারেক রহমান : ৩ জুন ২০১৯ ঈদের আগের দিন রাতে ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেয় বিএনপি। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। তাতে বলা হয়, ২০০০ সালের পর থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই ছাত্রদলের কমিটিতে স্থান পাবে। দলের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কমিটি গঠনে বয়সসীমা শিথিল করার দাবিতে ১০ জুন নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়। কার্যালয়ের ভেতরে রিজভীকেও তারা অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে গেলে নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন ও প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী।

এর আগে সকাল ১১টায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে নয়াপল্টন  থেকে শুরু হওয়া আইনজীবীদের একটি মিছিলে রুহুল কবির রিজভী যোগ দিলে তাকে অপদস্থ করেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধরা। তার বিরুদ্ধে নানা সেøাগান দেন তারা। পরে তারা রিজভীকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এক পর্যায়ে তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে নির্দেশ দেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের। তারা তাদের সমর্থকদের নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। এ কারণে তারেক রহমানের আস্থায় আসেন এই দুইজন ছাত্রনেতা।

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মেলনে সভাপতি প্রার্থী ছিলেন কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ। সেই সময় আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী হওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সে সময়ে এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান ছাত্রদল করতে পারবেন না এমন কোনো কথা নেই। কারও বাবা এক রাজনীতি করলে তার ছেলে ভিন্ন রাজনীতি কেন করতে পারবেন না। আমার বাবা মুসলিম লিগ করতেন আমি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতাম।’ 

যশোর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, যশোরের কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী রফিকুল ইসলামের ছেলে কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় উপজেলা জুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছেলে ছাত্রদলের বিগত কমিটির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি হওয়ায় তার বাবা কাজী রফিকুল ইসলাম নৌকার মনোনয়ন বঞ্চিত হন। পরে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সদ্য সমাপ্ত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। শ্রাবণের বড় ভাই কাজী মুস্তাফিজুর রহমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, মেজ ভাই কাজী মুজাহিদুল ইসলাম পান্না উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক, সেজ ভাই কাজী আজাহারুল ইসলাম মানিক উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক।

কেশবপুরের সন্তান কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় রবিবার রাতে মিষ্টি বিতরণ করেন উপজেলা, পৌর ও কলেজ ছাত্রদলের নেতারা। কেশবপুরের বর্তমান ও সাবেক ছাত্রনেতারা আনন্দ প্রকাশ করেছেন। কেশবপুর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, কেশবপুরের কৃতী সন্তান কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় কেশবপুরের ছাত্রদলের সব ইউনিট খুশি। 

উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল হালিম অটল বলেন, শ্রাবণ একজন পরিশ্রমী ও তুখোড় ছাত্রনেতা। এ খবরে সন্ধ্যায় বিএনপির দলীয় পার্টি অফিসে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত