লক্ষ্য এবার গোতাবায়া পালালেন মাহিন্দা

আপডেট : ১১ মে ২০২২, ০২:৩১ এএম

অর্থনৈতিক সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কার জনগণ ফুঁসে উঠেছে। অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার ঢেউ আছড়ে পড়ে রাজনীতিতেও। অবশেষে জনগণের ক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। কলম্বোতে কারফিউ জারি থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় নেমেছে দেশটির হাজার হাজার মানুষ। দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেরও পদত্যাগ চাইছেন তারা। তবে বড় ভাই পদত্যাগ করলেও নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে মরিয়া গোতাবায়া। বিরোধীদের নিয়ে তিনি একটি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের তোড়জোড় করছেন বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

বিক্ষোভকারীরা রাজাপাকসের পৈতৃক ভিটায় অগ্নিসংযোগ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন এমপি ও একজন বিচারপতির বাড়িও। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ দেখছে ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকা রাজাপাকসের পরিবার। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারি বাসভবনের প্রধান ফটক ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে কমপক্ষে ১০টি পেট্রলবোমা মারা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহিন্দা রাজাপাকসে ও তার পরিবারের সদস্যরা একটি হেলিকপ্টারে করে ত্রিঙ্কোমালির নৌঘাঁটিতে পৌঁছান। রাজধানী কলম্বো থেকে ওই নৌঘাঁটির দূরত্ব প্রায় ২৭০ কিলোমিটার। সেখানেও বিক্ষোভ চলছে।

সোমবার সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন একজন এমপি। তবে বলা হচ্ছে, তিনি বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি ছোড়ার আগে নিজেই নিজের ওপর গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কলম্বোয় সহিংসতায় ওই সংসদ সদস্যসহ সাতজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন আরও অন্তত দুইশজন। বিক্ষোভ-সহিংসতার মধ্যে সংসদ সদস্যরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সেজন্য দেশটির প্রধান বিমানবন্দর অবরোধ করেছেন সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। গতকাল মঙ্গলবার লঙ্কান সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর এ তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, কাতুনায়েকে অবস্থিত শ্রীলঙ্কার প্রধান বিমানবন্দর অবরোধ করেছে একদল তরুণ। বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারে গাড়ি রেখে অবস্থান নিয়েছে তারা। চলমান বিক্ষোভের মধ্যে এমপিদের দেশত্যাগ ঠেকাতে এ ব্যবস্থা নিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।

এদিকে সেনা ও পুলিশ বাহিনীকে জরুরি ক্ষমতা প্রদান করেছে শ্রীলঙ্কা সরকার। মঙ্গলবার পাওয়া এই ক্ষমতাবলে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের সুযোগ পাবে নিরাপত্তা বাহিনী। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী কাউকে গ্রেপ্তার করলে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের আগে ২৪ ঘণ্টা নিজেদের হেফাজতে রাখতে পারবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং যানবাহনে তল্লাশি চালাতে পারবে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘একজন পুলিশ অফিসার কর্র্তৃক গ্রেপ্তারকৃত যেকোনো ব্যক্তিকে নিকটস্থ থানায় নিয়ে যাওয়া হবে।’ জরুরি ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। কলম্বোভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি অল্টারনেটিভ কর্মকর্তা ভবানি ফনসেকা বলেন, ‘জরুরি ক্ষমতা এবং কারফিউ উভয়ই বলবৎ থাকা অবস্থায় এর অপব্যবহার নজরদারিতে রাখবে কে?’

গত শুক্রবার এক বিশেষ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া দেশজুড়ে চলা রাজনৈতিক সংকট সমাধানে বড় ভাই ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসেকে পদত্যাগ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পরে সেই আহ্বানে সাড়া দেন মাহিন্দা রাজাপাকসে। এর আগে গত শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে জানিয়েছিলেন যে, তার ভাই অর্থাৎ দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মতি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর অন্য মন্ত্রীরাও পদত্যাগ করতে শুরু করেছেন বলে শ্রীলঙ্কার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। দুই মন্ত্রীও এরই মধ্যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে পদত্যাগ করার কারণে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া একটি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য পার্লামেন্টে থাকা সব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন বলে খবর মিলছে। যদিও এর আগে বিরোধী এসজেবি পার্টি নিশ্চিত করে যে, তাদের নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না।

২৬ বছর ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনার পর শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী ২০০৯ সালের তামিল টাইগারদের পরাজিত করার মাধ্যমে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে সক্ষম হয়। আর সেই গৃহযুদ্ধে বিজয় আসে প্রধানমন্ত্রী এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনকালে। পরবর্তীকালে আবারও নির্বাচনে জয়ী হয় এই পরিবার। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শাসনভার পরিচালনার কারণে দুর্নীতিসহ নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত