সামাজিক মূল্যবোধে নৈতিক অবক্ষয়ের ছায়া

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১০:২০ পিএম

একুশ শতকের বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে তা হলো তরুণদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার। দিন দিন এটা মহামারীর মতো বেড়েই চলেছে। একটা দেশের এবং জাতির শক্তিশালী সম্পদ হচ্ছে যুবসমাজ। আর তাদের এই অবক্ষয় একদিনে তৈরি হয়নি। এই নৈতিক অবক্ষয়ের মূল কারণ হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকের বিস্তার, আকাশ সংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল, বেকারত্ব, ওদের যথোপযুক্ত মূল্যায়ন না করা। আমরা সবাই জানি, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। অর্থাৎ যুবসমাজই পারে শত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে দেশকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যুবসমাজ এখন বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতি হতাশায় নিমজ্জিত। যুবসমাজের অবক্ষয় জাতির বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। গোটা সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। আর এই সমস্যার প্রতিকার না হলে দেশ ও জাতি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে। একটি সমাজ ও একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পদ হলো তরুণ সমাজ। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি-সমৃদ্ধি নির্ভর করে তরুণ সমাজের ওপর। যেকোনো জাতির প্রাণশক্তি তাদের যুবসমাজ। যুবসমাজই জাতির আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক। যুবসমাজ যেকোনো দেশ ও জাতির সোনালি স্বপ্ন। আজকের যুবকরাই পরিচালনা করবে আগামীর সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতিকে। যুবকদের প্রেমময় রূপ ও শক্তির কারণে দরিদ্র, নিঃসহায় প্রবঞ্চিত ও নিগৃহীত জনতা লাভ করবে নতুন জীবন, প্রদীপ্ত হবে নব-উদ্দীপনায়। কিন্তু সম্প্রতি সেই যুবসমাজের প্রতি তাকালে জাতিকে অবাক হতে হয়। কারণ দেশ ও জাতির কর্ণধার সেই যুবসমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের অনেকেরই নৈতিক কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ নেই। এই যুবকদের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত, কেউ অসামাজিক, কেউ চাঁদাবাজি, কেউ অস্ত্রবাজি, কেউ চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, প্রভৃতি অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত।

নানাবিধ কারণে যুবসমাজের এই অবক্ষয় হতে পারে। যেমন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি, শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য, চাকরিক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা, অপসংস্কৃতি, অভিভাবকদের আদর্শহীনতা, সমাজপতিদের অনৈতিকতা, অর্থ, অস্ত্র ও ক্ষমতার লোভ এবং বেকারত্ব। সেই যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে নিপতিত করছে। আমাদের যুবসমাজ আজ শৃঙ্খলাহীন এক অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা এমন এক রীতিনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে, যা তাদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবন বিকাশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। দেশের  যুবসমাজের মধ্যে যেসব নৈতিক অবক্ষয় অনুপ্রবেশ করেছে, তার মূলে রয়েছে অবাধ দুর্নীতি। সম্প্রতি সত্য ও সুন্দরের পথ ত্যাগ করে যুবসমাজ উগ্র ও বিকৃত জীবনযাপনে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে এবং চরম অবক্ষয়ের মধ্যে জীবন খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমাদের যুবসমাজ আজ এ অপসংস্কৃতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। আমাদের সমাজের জনগণের অসচেতনতা, অশিক্ষা, অজ্ঞতা, আইন প্রয়োগে শিথিলতা ও দুর্নীতি, ইত্যাদির কারণে এই নৈতিক অবক্ষয়ের করালগ্রাসে নিপতিত হচ্ছে আমাদের তরুণ ও যুবসমাজ।

বাংলাদেশের অবস্থান গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ওয়েজের মধ্যবর্তী স্থান। এ কারণে এ দেশে মাদকদ্রব্য সহজলভ্য। ফলে যুবসমাজের হাতের নাগালে চলে আসে মাদকদ্রব্য যা তাদের মাদকাসক্ত হতে প্রলুব্ধ করে। মাদকাসক্ত হওয়ায় যুবসমাজের নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটে। ফলে আইন শৃঙ্খলতার অবনতি ঘটে। দেশের উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায় এই মাদকদ্রব্য। তাই দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য সর্বপ্রথম যুবসমাজকে মাদকের ভয়ংকর ছোবল থেকে বাঁচাতে হবে। তা-না হলে তাদের সৃজনশীল শক্তি লোপ পাবে এবং তারা অন্ধকারে ধাবিত হবে। তাই দেশের উন্নয়নের জন্য মাদককে না বলতে হবে। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মাদক নিষিদ্ধ করতে হবে। তবেই সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। মানুষের এই গুণগুলো যখনই লোপ পায় বা নষ্ট হয় তখনই শুরু হয় নৈতিক অবক্ষয়। কোনো একটি দেশের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হলো যুবসমাজ। তারা কখনো পরাজয় মেনে নেয় না এবং পুরাতনকে নতুন করে গড়তে চায়। কিন্তু এই যুবসমাজ যখন খারাপ দিকে ধাবিত হয় তখন সমাজের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা যায়। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতীয় জীবনে নেমে আসে চরম দুঃখ-দুর্দশা, বিপর্যয় ও হতাশা। যুবকরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্থ স্বাভাবিক পদচারণার মাধ্যমেই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। কিন্তু তারা যদি সৎ চারিত্রিক গুণাবলির সমাবেশ নিজেদের মধ্যে না ঘটায় তবেই তাদের নিজেদের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজ তথা দেশের সার্বিক অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যক্তি এবং সামাজিক জীবনে কোনো মানুষ কোনো কালেই সবার শ্রদ্ধা ও বিশ্বস্ততা লাভ করতে পারে না, যদি তার নৈতিক মূল্যবোধ না থাকে। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ স্বভাবতই উত্তম চরিত্রের হয়ে থাকে।

তাই সৎ চরিত্রের মানুষের প্রভাব পড়ে সমাজে কোনো একটি বিশেষ কারণে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের পতন ঘটে না, নানাবিধ কারণে এ অবক্ষয়ের শিকার হয় মানুষ, সমাজজীবনে চরম দারিদ্র্য শিক্ষিত বেকারের কর্মহীনতা, ভোগবাদী মানুষের বিলাসী প্রতিযোগিতা ধর্মীয় বিধিনিষেধকে গুরুত্ব না দেওয়া, মাদকাসক্ত হওয়া প্রভৃতি কারণে মানুষ তার নৈতিক মূল্যবোধ হারায়। যুবসমাজকে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, তাদের জীবনের এ সময়টাই হলো দায়িত্ব বিকাশের কাল, সামাজিক কর্তব্যবোধে দীক্ষিত হওয়ার সময়। একটা সুন্দর কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের তাগিদ থেকে আমাদের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের জাগরণ জরুরি। যুবসমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় রোধে আমাদের সবারই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষাঙ্গনের সমস্যা সমাধান, আধুনিক সমাজব্যবস্থায় সুন্দরভাবে জীবনযাপনের অন্যতম শর্ত হলো শিক্ষা। তাই যুবসমাজকে অন্ধকার থেকে মুক্তির জন্য শিক্ষিত করা প্রয়োজন।

জীবন ও সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো মাদকাসক্তি। যুবসমাজ আশঙ্কাজনক হারে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর ব্যাপকতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। ফলে ঐশীর মতো অনেকে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। বর্তমান সময়ে নীল মাদক ইয়াবা আগ্রাসনে দেশ এখন ক্ষতবিক্ষত। মাদক ব্যবহার এবং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যার অধিকাংশই তরুণ। সর্বোপরি কথা হচ্ছে, নীতি এখানে পদদলিত।

আমাদের যুবসমাজ বড়দের মধ্যে খুব কমই আদর্শবান মানুষ খুঁজে পাচ্ছে, যাদের থেকে তারা অনুপ্রেরণা পাবে। তারা অহরহ দেখছে রাজনীতির নামে মিথ্যাচার, সমাজ সেবার নামে স্বেচ্ছাচার, আদর্শের নামে প্রতারণা। সমাজের সর্বস্তরে মূল্যবোধের এই অবক্ষয়ের শিকার আমাদের যুবসমাজ, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা যুবসমাজকে বিপথগামী করার ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী। অসুস্থ ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ ছাত্ররা। আর তাই এখনই নিতে হবে সময়োপযুক্ত পদক্ষেপ, শিক্ষাঙ্গনকে করতে হবে সুশিক্ষার কারখানা। সব ধরনের মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, উৎপাদন, বিক্রি নিষিদ্ধ করে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। অপরাধীদেরও কঠোর হাতে দমন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, দুর্নীতিকে সবক্ষেত্রে পরিহার করতে হবে। সব ধরনের মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ করতে হবে।

যুবসমাজ অবক্ষয়ের কারণে দেশে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মধ্যে মাথা উঁচু করার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। যুবসমাজই দেশের প্রাণশক্তি, তাদের বিপথগামিতার অর্থ হলো গোটা জাতির ধ্বংস। তারাই জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। তাদের উদ্ধার করতে হবে অবক্ষয়ের অতল গহ্বর থেকে। তা না হলে গোটা জাতি অবক্ষয়ের সাগরে ডুবে মরবে। মানব সভ্যতায় যুবসমাজের রয়েছে মুখ্য ভূমিকা। তাই তাদের দিকে বাড়িয়ে দিতে হবে স্নেহের হাত। ওদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিচালিত করতে হবে সঠিক পথে। ওদের বোঝাতে হবে যে, ওদের দিকে চেয়ে আছে গোটা দেশ ও জাতি। তাই শুধু সরকার নয়, এই সমাজকেও বাড়িয়ে দিতে হবে ওদের দিকে সহানুভূতির হাত। তবেই রক্ষা করা যাবে যুবসমাজ আর বাঁচবে দেশ। বয়ে আনবে সমাজের জন্য কল্যাণ।

লেখক গবেষক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত