দেশের ৩১ শতাংশ বন নিধনে দায়ী তামাক চাষ

আপডেট : ৩১ মে ২০২২, ০২:৩০ এএম

দেশের প্রায় ৩১ শতাংশ বন নিধনের পেছনে দায়ী তামাক চাষ। বিশেষ করে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার তিনটি উপজেলায় তামাকপাতা শুকানোর (কিউরিং) কাজে এক বছরেই প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ ব্যবহৃত হয়েছে। স্থানীয় বন থেকে এসব কাঠ সংগ্রহ করায় পাহাড়গুলো বৃক্ষহীন হয়ে পড়ছে এবং সেখানকার অধিবাসীরা আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। এমনকি বিশ্বের মোট তামাকের ১ দশমিক ৩ শতাংশই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা টোব্যাকো অ্যাটলাস, গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ স্টাডি-২০১৯ ও দেশের তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) গবেষণা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, ‘তামাকের কারণে আমাদের আবাদযোগ্য জমি, বনভূমি, মৎসক্ষেত্র প্রভৃতি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ছে। পরিবেশ, প্রতিবেশ, জলবায়ু এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এই তামাক। সরকারের উচিত হবে শক্তিশালী আইন ও কর পদক্ষেপের মাধ্যমে তামাকের আগ্রাসন বন্ধ করা।’

তামাকের এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। তামাক চাষ, তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার এবং তামাকের বর্জ্য পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর সে বিষয়ে জনসাধারণ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘টোব্যাকো : থ্রেট টু আওয়ার এনভায়রনমেন্ট’। দিবসটি উপলক্ষে সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ‘বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং’ আজ মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তন একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

তামাক সেবনে শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ : গতকাল রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও নীতিগুলোর রক্ষাকবচখ্যাত এফসিটিসির আর্টিকেল ৫.৩ অনুসারে, তামাক কোম্পানির প্রভাব বন্ধে গাইডলাইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে একটি অধিক তামাক ব্যবহারকারী জনগণের দেশ “বাংলাদেশ”। সুতরাং জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। তামাক কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার সময় এসেছে।’

তামাক সেবন করে ৩৫% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ : গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস) আয়োজিত ‘তামাকমুক্ত পরিবেশ সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং সার্বিক উন্নয়নে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো “তামাক”। এ কথা সর্বমহলে স্বীকৃত। তামাক চাষাবাদ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবনসহ প্রতিটি ধাপেই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছরের অধিক বয়সীদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ বা ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাকজাত দ্রব্য সেবন করে। ২০০৯ সালে তামাকসেবী ছিল ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ। সুতরাং তামাক সেবনের শতকরা হার নিম্নগামী হয়েছে, যা আশার কথা। পক্ষান্তরে এমন কিছু অসামঞ্জস্যতা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যা তামাক নিয়ন্ত্রণে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বিঘ্নতা সৃষ্টি করছে।’

তামাক যেভাবে ক্ষতি করে চাষের ভূমির : এসব সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের শীর্ষ তামাক উৎপন্নকারী দেশগুলোর অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ভুক্ত দেশ এবং এসব দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ বন উজাড়ের জন্য দায়ী তামাক। ক্ষেতে কাজ করার সময় অজ্ঞাতসারেই একজন তামাকচাষি দিনে প্রায় ৫০টি সিগারেটের সমপরিমাণ নিকোটিন শোষণ করে থাকে। এছাড়া তামাক অন্যান্য শস্যের তুলনায় দ্রুত মাটির পুষ্টি নিঃশেষ করে মাটিকে অনুর্বর করে ফেলে। যেমন ভুট্টার তুলনায় তামাক মাটি থেকে প্রায় আড়াই গুণ বেশি নাইট্রোজেন, সাত গুণ বেশি ফসফরাস এবং আট গুণ বেশি পটাশিয়াম শোষণ করে থাকে।

গবেষণাগুলো আরও বলছে, উৎপাদন থেকে সেবন এ পুরো প্রক্রিয়ায় একটি সিগারেট শলাকা মোট ১৪ গ্রাম কার্বন-ডাইঅক্সাইড পরিবেশে নির্গত করে। বিশ্বে প্রতি বছর মোট ছয় ট্রিলিয়নসংখ্যক সিগারেট শলাকা উৎপাদিত হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ২২ বিলিয়ন টন পানি। তামাক ছাড়া অন্য যেসব উপাদান তামাকপণ্যে ব্যবহৃত হয়, যেমন সিগারেট ফিল্টার, পলিথিন, মোড়ক ইত্যাদি সেগুলো থেকেও পরিবেশ দূষিত হয়।

সেবনে ক্ষতি হয় পরিবেশের : গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তামাকপণ্যের ধোঁয়া থেকে বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে বছরে প্রায় ৩০০০-৬০০০ মেট্রিক টন ফরম্যালডিহাইড, ১২০০০-৪৭০০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত নিকোটিন বাষ্প এবং কয়েক হাজার টন গ্রিনহাউজ গ্যাস (কার্বন-ডাইঅক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইড) যুক্ত হয়। অন্যদিকে প্রতি বছর মোট ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ব্যবহৃত সিগারেট ফিল্টার আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেন ব্যবহারকারীরা। বিষাক্ত এ বর্জ্যরে ওজন প্রায় ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭১ মেট্রিক টন। সিগারেট কার্টন এবং মোড়ক থেকে আরও প্রায় ২ মিলিয়ন টন সমপরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হয়। সমুদ্র থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা বর্জ্যরে প্রায় ১৯ থেকে ৩৮ শতাংশই সিগারেট ফিল্টার।

বাংলাদেশে আর্থিক ক্ষতি : গবেষকরা জানিয়েছেন, তামাক চাষে ব্যবহৃত মোট জমি এবং উৎপাদিত তামাকপাতার পরিমাণ এ দুই বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ১৪তম ও ১২তম। বিশ্বের মোট তামাকের ১ দশমিক ৩ শতাংশই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক চাষে নেট সোশ্যাল রিটার্ন ঋণাত্মক, প্রতি একরে ক্ষতি ৯১৬ দশমিক ১১ ডলার। কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ একজন তামাকচাষি বছরে গড়ে ২ হাজার ৪৬ শ্রম ঘণ্টা পরিমাণ শ্রম কোনো প্রকার মজুরি ছাড়াই দিয়ে থাকেন। কখনোই তামাক চাষ করেনি, এমন কৃষকের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া শ্রম ঘণ্টার পরিমাণ প্রায় অর্ধেকেরও কম, মাত্র ৯৫২ ঘণ্টা। তামাক চাষে একরপ্রতি বিনিয়োগের রিটার্ন (আরওআই) ২২ শতাংশ, অথচ অন্যান্য শস্যের ক্ষেত্রে এই হার ১১৭ থেকে ১৫২ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।

খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি : এসব গবেষণায় বলা হয়েছে, ধান চাষের চেয়ে তামাক চাষে প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয়। কোনো জমিতে টানা তিন-চারবারের বেশি তামাক চাষ করলে জমি উর্বরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। বাংলাদেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৭ হাজার একর মাত্র। এসব জমিতে তামাকের চাষ বাড়ছে। প্রজ্ঞার তথ্য অনুযায়ী, তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক হালদা নদীর পানিতে মিশে যাওয়ায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি হুমকির মুখে পড়েছে।

বাড়ছে বহুমুখী দূষণ : গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চার কোটিরও অধিক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, যার সিংহভাগই নারী। আচ্ছাদিত কর্মস্থলে ৮১ লাখ মানুষ ও গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় আড়াই কোটি মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েছে।

ঢাকা শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী ছাত্রছাত্রীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর মুখের লালাতেই উচ্চমাত্রায় নিকোটিন পাওয়া গেছে, যা মূলত পরোক্ষ ধূমপানের ফল।

সিগারেটের ফেলে দেওয়া ফিল্টারও পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ওই গবেষণায় বলা হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট ৭১ বিলিয়ন সিগারেট শলাকা উৎপাদিত হয়েছে। সিগারেটের ফেলে দেওয়া ফিল্টার প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে প্রায় এক দশক সময় নেয় আর মিশে যাওয়ার সময় এ থেকে সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়। শুধু সিগারেটই নয়, জর্দা, গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যগুলোও প্লাস্টিক কৌটা ও পলিথিন প্যাকেটে ভরে বিক্রি করা হয়, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত