বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত দেড় মাস ধরে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির গোলাগুলি চলছে। সীমান্তে ওপারের গোলাগুলির এ প্রচণ্ড শব্দে কাঁপছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি তমব্রু এবং কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্ত এলাকাও। বিস্ফোরেণের বিকট শব্দে সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা এবং শূন্য রেখার আশ্রয়শিবিরের কয়েক হাজার রোহিঙ্গা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে ছোড়া কয়েকটি মর্টার শেল ও গুলি সীমান্ত অতিক্রম করে পড়েছে বাংলাদেশের মাটিতেও। যার মধ্যে শূন্য রেখার আশ্রয়শিবিরে পড়া মর্টার শেলে এক রোহিঙ্গা নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছে এসব মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকার কিছু মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু সীমান্তবাসীরা কোনোভাবেই তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে রাজি নয়। তারা চায় তাদের জীবনের নিরাপত্তা।
এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরে উখিয়ার বালুখালী সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জেলার পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমানসহ জেলা, উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা। এ ছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রশাসন মিয়ানমারের পরিস্থিতির কারণে সীমান্ত এলাকার কিছু পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করলেও এসব পরিবারের সদস্যরা এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। সীমান্তঘেঁষা জনপদের এসব মানুষ বলছে, ঘরবাড়ি, জমি, ক্ষেতখামার ও গৃহপালিত পশুর সাময়িক ক্ষতি হলেও তারা সীমান্তেই থাকতে চায়। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দাবি করেছে তারা।
নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু কোনারপাড়ার ষাটোর্ধ্ব ফরিদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় জন্ম, সীমান্তেই আমাদের বসবাস। যুগ যুগ ধরে বাপ-দাদারা এ সীমান্তেই বসবাস করে আসছে। জীবনে মিয়ানমারের ওপারে অনেক কিছুই দেখেছি। কিন্তু কোনোদিন এলাকা ছেড়ে যাইনি। এবারও কোথাও যাব না। প্রশাসন মনে করলে আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারে। না হলে সীমান্তেই জীবনমরণ।’
তমব্রু পশ্চিমপাড়ার আবদুল গফুর বলেন, ‘মিয়ানমারে ওপারে গোলাগুলিতে আমরা আতঙ্কিত। এ পরিস্থিতিতে সরকার যদি আমাদের সরিয়ে নিতে চায়, তাহলে আমরা সীমান্ত ছেড়ে কোথাও যাব না। সীমান্তে আমাদের জীবনমরণ জড়িত। আমাদের কোথাও সরানো মানে আমাদের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করা।’
একই ধরনের অনুভূতির কথা জানিয়ে তমব্রু বাজারপাড়া এলাকার মাওলানা রফিক উদ্দিন বলেন, ‘আমার বাড়ি হচ্ছে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষা। আমার বাড়ির ঠিক ওপারে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পে বসে আমার বাড়ির উঠানের সবকিছু দেখা যায়। কাজেই আমাদের খুব ভয় হচ্ছে। কোন সময় কী হয়ে যায় কে জানে? সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচুর সদস্য নিয়োগ দিয়ে আমাদের নিরাপত্তা দিলে খুশি হতাম।’
একই এলাকার মোহাম্মদ আবছার উদ্দিন বলেন, ‘মিয়ানমারে ওপারে গোলাগুলির কারণে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। সীমান্তের কাঁটাতারের পাশের জমিতে রয়েছে ধানক্ষেত। আমরা বেশ কয়েক দিন ধরে চাষাবাদে যেতে পারছি না। বের করতে পারছি না গরু-ছাগল। আবার এগুলো ফেলে কোথাও যাওয়া যাচ্ছে না। আমরা খুব নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি।’
মিয়ানমার সীমান্তের তমব্রু কাঁটাতারের ১০ গজের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ আরিফের বসতবাড়ি। তিনি বলেন, ‘সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী মাটিতে মাইন পুঁতে রেখেছে। যেকোনো মুহূর্তে বিপদ হতে পারে। ইতিমধ্যে সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে অনেকেই আহত-নিহত হয়েছে।’
তমব্রু কোনারপাড়ার শূন্য রেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘মিয়ানমার ইচ্ছেকৃতভাবে শূন্য রেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের তাড়াতে চায়। মিয়ানমার চায় না আমরা শূন্য রেখায় থাকি। এ কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প লক্ষ্য করে মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে। আমরা বিষয়টি চিঠি দিয়ে জাতিসংঘকে জানিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন মিয়ানমারের ওপারে আরকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গোলাগুলিতে প্রকম্পিত সীমান্ত এলাকা। খবর পেয়েছি রাখাইনে কয়েকটি সীমান্ত ফাঁড়ি আরকান আর্মি দখল করে নিয়েছে। তাই দখল হয়ে যাওয়া সীমান্ত ফাঁড়ি উদ্ধার করতে হেলিকপ্টার ও জেট বিমানের মাধ্যমে নির্বিচারে গুলি ফেলা হচ্ছে। এ কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অন্ধকারে রয়েছে।’
উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সতর্কাবস্থায় থাকার কথা উল্লেখ করে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘যেহেতু সীমান্ত এলাকায় বসবাস, সেহেতু সমস্যা একটু হবে। এ জন্য বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সীমান্ত এলাকার মানুষরা অদম্য সাহস নিয়ে এগিয়ে যাবে। সরকারের সুন্দর চিন্তাভাবনায় আমাদের আস্থা রয়েছে।’
সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুমের তমব্রু সীমান্ত পরিদর্শন করেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভিন তিবরিজী। এ সময় তিনি বলেন, ‘নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনা স্বাভাবিকভাবে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। এ কারণে সীমান্তে বসবাসরত মানুষের নিরাপত্তার বিষয়ে করণীয় কী করা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের বালুখালী সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের বিষয়ে পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সীমান্তের সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে ডিসি ও এসপি স্যার এসেছিলেন। তবে আজ (বুধবার) গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি। সীমান্তের পরিস্থিতি খারাপ হলে শতাধিক পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।’
