মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সোচ্চার হওয়া শীর্ষ রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার এক বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। গত বছর এই দিনে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের নিজ অফিসে তাকে গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় হওয়া মামলাটিতে বর্তমানে আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। অন্যদিকে কানাডায় আশ্রয় মিলেছে মুহিবুল্লাহর পরিবারের অন্যান্য সদস্যের। কিন্তু এরই মধ্যে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে হত্যা, হামলা, গোলাগুলিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দিন দিন বাড়ছে।
গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের ডি-ব্লকে নিজের অফিসে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ। এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে অশান্ত হয়ে ওঠে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ক্যাম্পের নেতা ও স্বেচ্ছাসেবকদের টার্গেটে পরিণত করে। যার ধারাবাহিকতায় গত চার মাসে ক্যাম্পে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন ১৬ জন রোহিঙ্গা নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক। রোহিঙ্গা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ও ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার এবং রোহিঙ্গারা যাতে দলবদ্ধ হয়ে প্রত্যাবাসনসহ নিজের অধিকারের কথা বলতে না পারে তার জন্য এসব টার্গেট কিলিং হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে চলতি বছর ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১১৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত চার মাসে ১৬ জন খুন হয়েছেন। আর এসব খুনের শিকার রোহিঙ্গারা ক্যাম্পভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতা (মাঝি) ও স্বেচ্ছায় পাহারারত স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিনটি ব্যাটালিয়ন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। পাশাপাশি জেলা পুলিশও এপিবিএনকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পে এপিবিএনের তিনটি ব্যাটালিয়ন নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। এপিবিএনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ এরশাদ (২২) নামে এক স্বেচ্ছাসেবক খুন হন। তার আগের দিন খুন হন মোহাম্মদ জাফর (৩৫) নামে এক নেতা (মাঝি)। ১৮ সেপ্টেম্বর খুন হন আরেক স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ ইলিয়াস (৩৫)। ৯ আগস্ট দুই রোহিঙ্গা নেতা, ৮ আগস্ট টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক স্বেচ্ছাসেবক খুন হন। ১ আগস্ট একই ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক নেতা মারা যান। একই দিন উখিয়ার মধুরছড়া ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক, গত ২২ জুন কথিত আরসা নেতা মোহাম্মদ শাহ এবং ১৫ জুন একই গ্রুপের সদস্য মো. সেলিম (৩০) সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। ১৬ জুন রাতে উখিয়া ক্যাম্পে এক স্বেচ্ছাসেবক, ১০ জুন কুতুপালংয়ের ৪ নম্বর ক্যাম্পের আরেক স্বেচ্ছাসেবক, ৯ জুন এক রোহিঙ্গা নেতা এবং তার আগে মে মাসে খুন হন রোহিঙ্গা নেতা সানাউল্লাহ (৪০) ও সোনা আলী (৪৬)।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ বাড়ায় উদ্বিগ্ন ক্যাম্পের আশপাশের লোকালয়ের বাসিন্দারাসহ পুরো কক্সবাজার জেলাবাসী। উখিয়ার কুতুপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাম্পের পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ক্যাম্পভিত্তিক মাঝি (নেতা), সাব-মাঝি, স্বেচ্ছাসেবকদের খুন করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের অবস্থান ঘোষণা করে যাচ্ছে।’
কক্সবাজার পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, ‘রোহিঙ্গারা স্বাভাবিকভাবে নেতা মানতে চান না। কেউ নেতা হয়ে উঠবে বা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে তা না মানার প্রবণতা তাদের রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের নেতৃত্বশূন্য করার কোনো মিশন সশস্ত্র গোষ্ঠী বা ভিন্ন কোনো মহল পরিচালনা করছে কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি।’
খোঁজ নেই খুনের দায় স্বীকার করে ভিডিও বার্তা দেওয়া তরুণের : অস্ত্র হাতে নিজেকে কক্সবাজারের উখিয়ার আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গা দাবি করে মোহাম্মদ হাশিম নামে এক তরুণ ভিডিও বার্তায় চারজন রোহিঙ্গাকে হত্যার দায় স্বীকার করেন। গত বুধবার দুপুরে ওই তরুণের ভিডিও বার্তাটি ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাশিম বলেন, যারা প্রত্যাবাসন নিয়ে কাজ করেন, তাদের হত্যার জন্য ২৫ জন রোহিঙ্গা তরুণ-যুবককে ২৫টি পিস্তল দিয়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘ইসলামি মাহাজ’। সর্বশেষ পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে তারা (তরুণরা) রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের তিন মাঝিসহ এক স্বেচ্ছাসেবককে হত্যা করেছে। এই ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে তোলপাড় শুরু হয়। হাশিমের খোঁজে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওই তরুণের হদিস পায়নি তারা। হাশিম উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৮ নম্বর আশ্রয় শিবিরের (ময়নারঘোনা) ব্লক-৩ পশ্চিম-এর মৃত আবদুল জব্বারের ছেলে বলে ভিডিও বার্তা থেকে জানা যায়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এপিবিএন-৮-এর অতিরিক্ত সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি যাচাই-বাছাই চলছে। একই সঙ্গে ভিডিওতে এ যুবক যাদের নাম উল্লেখ করেছে, তদন্তসাপেক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ক্যাম্পের নিরাপত্তার জন্য আমরা সবসময় সজাগ রয়েছি।’
