আচরণে আড়াল আ.লীগের কীর্তি

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২২, ০৪:০৩ এএম

দলীয় নেতাকর্মীর অশোভন ও অসংযত আচরণ আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে সরকার ‘ম্যাজিক’ দেখালেও দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অশোভন ও অসংযত আচরণ সাধারণের মধ্যে দলের ভাবমূর্তিকে অন্যভাবে তুলে ধরছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা ও ভয় আছে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার জরিপেও উঠে এসেছে দলীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের অসৌজন্যমূলক আচরণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি। এ ছাড়া দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় দলীয় সভাপতির কাছে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের জমা দেওয়া একাধিক প্রতিবেদনেও নেতাকর্মীদের আচরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অশোভন-অসৌজন্যমূলক আচরণ বেড়েছে। আর দলের ভেতরে একধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। তবে তিনি বলেন, কারও অশোভন আচরণ সহ্য করার আর কোনো সুযোগ নেই। দল করতে হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশ পরিচালনায় বিশেষ অবদান রাখা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা সেভাবে না বাড়ার অন্যতম কারণ জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে অশোভন আচরণ। তিনি বলেন, সম্প্রতি করা ওই জরিপে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা যার কাছে পর্বতচূড়ায়, তার কাছেই প্রধানমন্ত্রীর দল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য বা অন্য জনপ্রতিনিধি অজনপ্রিয়।

সভাপতিমন্ডলীর ওই সদস্য দাবি করেন, সর্বস্তরের নেতাকর্মীর আচার-আচরণ সংশোধন করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের আচরণে পরিবর্তন না এলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তৃণমূল সফরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা স্থানীয় নেতাকর্মীদের আচরণ বদলানোর কথা বারবার বলছেন, সতর্ক করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ নেতাদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এমন আরেকটি জরিপ হয়েছিল। ওই জরিপেও অন্য কারণের সঙ্গে নেতাকর্মীদের আচরণে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় বেশি বিরূপ প্রভাব দেখা গেছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্রে জানা যায়, লিখিত ও মৌখিক অনেক অভিযোগ কেন্দ্রীয় দপ্তরে স্তূপ হয়ে আছে। ওই অভিযোগ থেকে জানা যায়, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা-পৌরসভা ও জেলা আওয়ামী লীগের বড় অংশে চলছে ক্ষমতা ও আধিপত্য ধরে রাখার নগ্ন প্রচেষ্টা। আধিপত্যের এ লড়াইয়ে টিকে থাকতে প্রয়োজন পড়লে বেপরোয়া আচরণেও দ্বিধা নেই ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কোনো পর্যায়ের নেতারই। এমন ‘বেপরোয়া বাহিনীর’ বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তাদের লাগাম টানা যাচ্ছে না।

যেসব জায়গা থেকে এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, নাটোর, নড়াইল, বগুড়া, কুমিল্লার দাউদকান্দি, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, চাঁদপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলা।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের নেতাকর্মীদের রূঢ় আচরণ দলের ও সরকারের জনপ্রিয়তায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আচার-আচরণে সংবেদনশীল-সহনশীল হলে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে সেরা অবদান রাখা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের জনপ্রিয়তার কাছে কোনো শক্তিই দাঁড়াতে পারত না। তিনি বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ভোট শেষে অনেকেই বদলে যান। জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকেন না। সাধারণ মানুষের কাতারে নামেন না তারা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের ভিন্ন পরিস্থিতিতে দলে বেপরোয়া আচরণ করা নেতাকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। পরিস্থিতির কারণে একসময় তাদের এমন আচরণ সহ্যও করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়েছিল। সংগত কারণে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করে তিন জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ যুগের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি রাজনীতি না বুঝে, না করে চেয়ারে বসার সুযোগ পেয়ে যাওয়ার কারণে এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে নির্দলীয় হওয়ায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্মকা- ও সমালোচনা সরাসরি দলের ওপর পড়ত না। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার নিয়ম হওয়ায় তাদের অনৈতিক কর্মকা- দলের ঘাড়ে এসে পড়ে। দলের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কিছু শীর্ষ সারির নেতা বাণিজ্য করার সুযোগে অযোগ্য ও বিতর্কিত অনেকেই মনোনয়ন পেয়ে যান। ফলে তাদের অরাজনৈতিক আচরণের দায়ও আওয়ামী লীগকে নিতে হচ্ছে।    

এ নিয়ে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে কয়েক দফায় সতর্ক করলেও তাদের আচরণের উন্নতি ঘটেনি বলে দাবি করেন দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। ওই নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন,  অভিযোগ রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা, স্থানীয় সরকারের অধীনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আচরণ বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। জনসম্পৃক্ত হতে এবং জনগণের দুয়ারে যেতে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা অনেক আগে থেকেই তাগাদা দেন। দলের অনেকেই এ নির্দেশনা মেনে চলছেন না। অনেক সংসদ সদস্যও নিজের এলাকার মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত।

দলের কেন্দ্রীয় ওই নেতারা বলেন, নিজের দলের নেতাকর্মীদের আচরণগত কারণে সরকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ক্ষতিটা বেশি হচ্ছে আওয়ামী লীগেরই। জনপ্রতিনিধিদের সংযত আচরণ না থাকায় দেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসামান্য অবদান সাধারণ মানুষের আলোচনায় আসছে না; বরং তারা সমালোচনা করছে দলীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের অশোভন আচরণের।

আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিরা যদি সংযত আচরণ চর্চা করতেন, তাহলে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেক উচ্চতায় চলে যেত। ওই নেতারা আরও বলেন, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বেশি অসংযত আচরণ করেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাঙ্গপাঙ্গরা। তাদের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত। কোনো কোনো জনপ্রতিনিধির সাঙ্গপাঙ্গদের কারণে সাধারণ মানুষ নিজের প্রাপ্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হওয়ার মতো ঘটনা রয়েছে। বিপদগ্রস্ত সাধারণ মানুষ জনপ্রতিনিধিদের শরণাপন্ন হলে সঠিক সমাধান না পাওয়ার অভিযোগও আছে। পাশাপাশি ক্ষমতার দাপট আছে, এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। জনপ্রিয়তার প্রশ্নে এ বিষয়গুলো মানুষের ভেতরে বিরূপ ধারণা তৈরি করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আচরণগত সমস্যাকে দুরারোগ্য ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি হয়ে পড়েছে দলে এমন আলোচনা আছে। তা না হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি জৌলুশ ও ঐতিহ্য হারাবে বলে নেতারা মনে করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন এলাকার খবর নিতে গিয়ে দেখেছি, স্থানীয় রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে। অনেক জনপ্রতিনিধি তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, এমন অভিযোগও রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত