যুদ্ধাপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বেলারুশের এক ব্যক্তি এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের দুই মানবাধিকার সংগঠনকে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
নরওয়ের নোবেল ইনস্টিটিউট গতকাল শুক্রবার অসলোতে এক সংবাদ সম্মেলনে ১০৩তম নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বেলারুশের মানবাধিকারকর্মী অ্যালেস বিয়ালিয়াৎস্কি, রাশিয়ার মানবাধিকার সংগঠন মেমোরিয়াল এবং ইউক্রেনের সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিসের নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটি বলছে, কয়েক বছর ধরে নিজ নিজ দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার অধিকারসহ নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখায় ভূমিকা রেখে আসছেন এবারের শান্তি নোবেল বিজয়ীরা।
বিবিসি বলছে, মানবাধিকারকর্মী অ্যালেস বিয়ালিয়াৎস্কি (৬০) বর্তমানে বেলারুশে বিনা বিচারে কারাবন্দি আছেন। ১৯৯৬ সালে বেলারুশে মানবাধিকার সংগঠন ভায়াসনা হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন অ্যালেস। বেলারুশের শাসক আলেজান্দার লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো দমননীতি নিয়ে কাজ করেছিল তার সংস্থা ভায়াসনা। সংস্থাটি তখন কারাবন্দি বিক্ষোভকারী ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। পাশাপাশি বেলারুশ কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর চালানো নির্যাতনের অভিযোগ-সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করেছিল। ২০১১ সালে কর ফাঁকির অভিযোগে তিন বছর জেল খাটেন বিয়ালিয়াৎস্কি। এরপর সর্বশেষ ২০২০ সালে লুকাশেঙ্কো বিরোধী আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তিনি।
নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যালেস বিয়ালিয়াৎস্কি নিজ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও শান্তিপূর্ণ প্রবৃদ্ধিতে নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। কারাবন্দি অ্যালেসের শান্তিতে নোবেল জয়ে তার স্ত্রী নাতালিয়া পিনচাক এএফপিকে বলেন, ‘অ্যালেস ও সহকর্মীদের এবং তার সংস্থার কাজকে স্বীকৃতি জানানোয় আমি নোবেল কমিটি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।’
সংগঠন হিসেবে ২০২২ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে রাশিয়ার পুরনো মানবাধিকার সংগঠন মেমোরিয়াল । এ বছরের শুরুর দিকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে আসা সংগঠনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। মেমোরিয়াল মূলত সোভিয়েত আমলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, কারাবরণ ও হত্যার শিকার হওয়া লোকজনের তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। রাশিয়ার বিদেশি গুপ্তচর আইন-২০১২ লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট মেমোরিয়ালের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মেমোরিয়াল। ‘অতীতের অপরাধ মোকাবিলা নতুনকে প্রতিরোধ করার জন্য অপরিহার্য’ এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল মেমোরিয়াল। এরপর চেচেন যুদ্ধের সময় রাশিয়া এবং রুশপন্থি বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার এবং যুদ্ধাপরাধের সেসবের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করেছে মেমোরিয়াল। ২০০৯ সালে চেচনিয়ায় মেমোরিয়াল শাখার প্রধান নাতালিয়া এস্তেমিরোভা সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে খুন হতে হয়।
এ বছর দ্বিতীয় সংগঠন হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে ইউক্রেনের মানবাধিকার সংস্থা সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিস। দেশটিতে মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সংস্থাটি। ইউক্রেনীয় সুশীল সমাজকে শক্তিশালী করা এবং ইউক্রেনকে একটি পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের দেশে পরিণত করার জন্য কর্র্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী এক শক্তি হিসেবে কাজ করছে সংস্থাটি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনের জনগণের ওপর রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধ শনাক্ত ও নথিভুক্ত করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিস। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ শনাক্ত ও নথিভুক্ত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিস।
এর আগে গত বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন দুই সাংবাদিক। তারা হলেন ফিলিপিনো সাংবাদিক মারিয়া রেসা ও রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ। সাহসিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ২০২১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তাদের।
