দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। গাইবান্ধার উপনির্বাচন এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই সরকারের উচিত অবিলম্বে পদত্যাগ করে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়া। গত ১৫ বছরে সরকার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। মানুষের ভোটের অধিকার ধ্বংস করেছে। ময়মনসিংহের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রবাস মাঠে বিএনপির সমাবেশে নেতাকর্মীদের সামনে এসব কথা তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, জ¦ালানি তেল, চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের গুলিতে হত্যা, হামলা এবং মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার বিএনপির এই বিভাগীয় সমাবেশ হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সমাবেশের মঞ্চে খালেদা জিয়ার জন্য একটি চেয়ার ফাঁকা রেখে বেলা ২টায় বিভাগীয় গণসমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। সভা শুরুর আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রাবাস মাঠ। এর আগে সকাল থেকে ধানের শীষ, জাতীয় ও দলীয় পতাকা এবং নেতাকর্মীদের ছবিসংবলিত ব্যানার হাতে খ- খ- মিছিল নিয়ে মাঠে অবস্থান নেন নেতাকর্মীরা।
মির্জা ফখরুল বলেন, ময়মনসিংহের মুক্তিকামী জনগণকে ধন্যবাদ দিতে চাই, কারণ তারা গণতন্ত্র রক্ষা করতে, নিজেদের অধিকার আদায়ে অবস্থান নিয়ে আজকের এই সমাবেশকে জনসমুদ্রে পরিণত করেছেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ বলেছিল, এই সমাবেশ প্রতিহত করবে। কিন্তু মুক্তিকামী মানুষের জনস্রোতে ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে।
সমাবেশ থেকে মির্জা ফখরুল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা এবং সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারকে পদত্যাগ করে, সংসদ বিলুপ্ত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ বলেছিল, ১০ টাকা কেজি চাল দেবে, এসব তাদের জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজির কথা। বর্তমানে জ্বালানি তেলে, চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের মূল্য লাগামহীন। জিনিসপত্রের দাম নিয়ে মানুষ খুব অসহায় অবস্থায় আছে। সরকার সাংবাদিকদের অধিকার খর্ব করতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করেছে। ফেইসবুক নিয়ন্ত্রণ করতেই এই আইন পাস করেছে।
সমাবেশে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও মহানগর বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক আবু ওয়াহাব আকন্দ ও উত্তর বিএনপি নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদারের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মশিউর রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা কাওসার কামাল, সাংগঠনকি সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সহসাংগঠনিক সম্পাদক ওয়ারেছ আলী মামুন ও শরীফুল আলম, বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন, শেরপুর জেলা বিএনপি নেতা মাহমুদুল হাসান রুবেল, নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. আনোয়ার হোসেন, ময়মনসিংহ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ আমজাদ আলীসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা।
এদিকে, সমাবেশ ঘিরে শনিবার সারা দিনই ময়মনসিংহ নগরীতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ছিল। নগরীতে রিকশা, অটোর চলাচল ছিল সীমিত। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নগরীর মোড়ে মোড়ে পুলিশ মোতায়েন ছিল। সমাবেশকে কেন্দ্র করে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দেন বাসচালকরা। শুধু বাস নয়, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনও চলাচলে বাধা দেওয়া হয়। তবুও বিভিন্নভাবে ছোট ছোট যানে করে নেতা-কর্মীরা সভাস্থলে আসেন।
সমাবেশের কারণে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা। সকাল থেকে নগরীর পাটগুদাম বাসস্ট্যান্ড, ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড, মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। এমনকি সিএনজি, লেগুনাসহ ছোট ছোট যান চলাচল ছিল সীমিত। আকস্মিক এমন ঘটনায় সাধারণ যাত্রীরা চরম অসেন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, তারা বাস বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেক মালিক গাড়ি বের করেননি।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় ঘটনাস্থলে ককটেল ও টিয়ারগ্যাস সেল নিক্ষেপের শব্দ শোনা যায়। তবে পুলিশ টিয়ারগ্যাস সেল নিক্ষেপের ঘটনা অস্বীকার করেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ শনিবার বিকেল ৩টায় রেলওয়ে স্টেশন কৃষ্ণচূড়া চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালনের জন্য জমায়েত হয়। এতে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুলের নেতৃত্বে জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা অংশগ্রহণ করেন।
এদিকে, বিকেল সাড়ে ৪টায় ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ থেকে কয়েক শ নেতা-কর্মী নগরীর বাঘমারা এলাকা দিয়ে রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশের সময় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মুখোমুখি হলে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে তিনজন আহত হন। পরে পুলিশ দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। রেলওয়ে স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ওই সময় ককটেল ও টিয়ার সেলের শব্দ শোনা যায়। তবে কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা বলতে পারি না।’
খালেদা জিয়ার জন্য আসন খালি : ময়মনসিংহে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের মঞ্চে একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়। নেতাদের সম্মতিক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরুর ঘোষণা দেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। সভা শুরুর কয়েক মিনিট পরে সমাবেশের প্রধান অতিথি হিসেবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। পাশে একটি আসন খালি রাখা হয় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য।
