সকালে ছিল মিষ্টি রোদের ঝিলিক। তবে সকালের সূর্য যে সারাদিনের পূবর্ভাস দেয় না, তা বোঝা গেল বেলা পড়তেই। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই নামে বৃষ্টি। তাতে শঙ্কা জাগে বল মাঠে গড়ানো নিয়ে। তবে বাদলের ধারা থেমেছে খানিক বাদেই। তাতে যথা সময়েই টস আর বল মাঠে গড়ায়। তবে অপেক্ষার বাকি ছিল আরও। বল হাতে ইনিংসের প্রথম ওভারেই উইকেট শিকার করেন তাসকিন। তাতে শুরুতেই দারুণ কিছুর আভাস পাওয়া গিয়েছিল। তবে ডি-কক আর রাইলি রুশোর ব্যাটে দক্ষিণ আফ্রিকা সে চাপ সামলে বড় লক্ষ্য দেয় টাইগারদের।
সেই লক্ষ্য তাড়ায় নেমে টাইগারদের শুরুটা হয় দুর্দান্ত। সৌম্য সরকারের দুই ছক্কায় প্রথম ওভারেই বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ১৭ রান। সেই ম্যাচটাই সাকিবরা হারলেন ১০৪ রানের বড় ব্যবধানে। নির্ধারিত ওভার পর্যন্তই ব্যাট করতে পারেননি লিটন দাসরা। নূন্যতম লড়াইটাও করতে পারেননি তারা। একটা সময় মনে হয়েছিল তিন অংকের ঘরেই যেতে পারবে না। তবে শেষ পর্যন্ত মোস্তাফিজ আর তাসকিন সেই লজ্জা এড়িয়েছেন।
খেলা শুরুর আগে ও মাঝে আবহাওয়ার যে বৈরিতা ছিল, শেষ তা আর থাকেনি। তেমনি ব্যাটিং ইনিংসের শুরুতে যে বৈরি চাপে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, নির্ধারিত ওভার শেষে তা ছিল জ্বলজ্বল করছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাটিং ও বোলিংয়ে ঝলমলে শুরু পেলেও শেষটা হয়েছে মলিন। যেন আবহাওয়ার মতই রোদ উঠল বৃষ্টি ঝরল টাইগারদের খেলায়।
সিডনির আকাশের আবহাওয়া আর বাংলাদেশি বোলারদের পারফরম্যান্স যেন এক সুতোয় গাঁথা। অস্ট্রেলিয়াতে এখন চলছে বসন্ত কাল। কিন্তু তাতেও শরতের ছোঁয়া, কখনও রোদ তো পরক্ষণেই আবার বৃষ্টি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষের ম্যাচে টাইগারদের পারফরম্যান্সও এমনই। শুরুতেই দারুণ কিছুর আভাস মিললেও শেষে সেটা আর থাকে না।
পারফরম্যান্সের কথাই যদি ধরা হয়, তবে টাইগাররা সেটা দেখিয়েছে সুপার টুয়েলভে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই। নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে সৌম্য আর শান্তর দারুণ শুরুর পরেও মাত্র ১৪৪ রানে থামতে হয় তাদের। আজ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও সেই ধারাই বজায় থাকে।
বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভের খেলাটি সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শুরু হয় বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টায়। স্থানীয় সময় বেলা ২টা। সিডনির আকাশ সকাল থেকেই ছিল ঝকঝকে নীল। সঙ্গে ছিল চকচকে রোদ। কিন্তু বেলা গড়াতেই নামে বৃষ্টি। অবশ্য সেই বৃষ্টি দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়নি। খানিক পরেই থেমে যায়। তাতে সময় মতোই টস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হেরে যান টাইগার অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।
তখনই জানা যায়, টাইগারদের একাদশে আনা হয়েছে একটি পরিবর্তন। যা অনুমিতই ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লড়াই করতে দলে একজন বাড়তি বোলারের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। ম্যাচের আগের অবধি ধারণা করা হয়েছিল, ফিরতে পারেন স্পিনার নাসুম আহমেদ। মেহেদী মিরাজও ছিলেন সেই ধারণায়। তবে এশিয়া কাপ থেকে যাকে মেকশিফট ওপেনার হিসেবে দেখা গেছে। বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজেও ওপেনিংয়েই নামানো হয় মিরাজকে। তবে এই ম্যাচে তাকে বোলারের ভূমিকায় একাদশে ফেরানোটা অবাকই করেছে।
যদিও টাইগারদের ক্রিকেটে অবাক করার মতো ঘটনা নতুন কিছু নয়। এই এশিয়া কাপ, কিংবা বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। সাব্বির রহমান তিন বছর পর দলে ফেরেন নিজেকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই। একইভাবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে ফেরানো হয় নাজমুল হোসেন শান্তকেও। তাই আজকের একাদশে মেহেদী হাসান মিরাজের অন্তর্ভুক্তিতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।
সেই মেহেদী মিরাজ অবশ্য বোলিংয়ে আসেন ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই। তবে টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি। ৩ ওভারে ৩২ রান দিয়ে থেকেছেন উইকেট শূন্য। প্রথম ওভারে এসেই দেন ৮ রান। তার আগের ওভারেই ইনিংসের শুরুটা করেন তাসকিন আহমেদ। সেই ওভারেই ফেরান প্রোটিয়া অধিনায়ক টেম্বা বাভুমাকে। তাতে ম্যাচে দারুণ কিছুর ইঙ্গিত মিলছিল। কিন্তু তৃতীয় ওভারে এসে যেন খেই হারিয়ে ফেলেন। পরপর দুটি নো বল দিতেই যেন প্রোটিয়াদের ঘুরে দাঁড়ানো শুরু হয়। সেখান থেকেই তার খুঁজে পায় বড় সংগ্রহের পথ।
তবে ম্যাচের পাওয়ার প্লের শেষ ওভারের তৃতীয় বল গড়ানোর পরই ফের নামে বৃষ্টি। যাতে খেলা বন্ধ রাখতে হয়। প্রায় ২০ মিনিট পর খেলা শুরু হলে প্রোটিয়া দুই ব্যাটার রাইলি রুশো আর ডি কক যেন আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠেন। ডি কক ৬৩ রান করে ফিরে গেলও টিকে যান রুশো। আর তাতে পেয়ে যান এই সংস্করণে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় শতক। শেষ পর্যন্ত ফিরেছেন ১০৯ রান করে। এটাই তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংস।
রুশোর শতকের পর দক্ষিণ আফ্রিকা ৫ উইকেট হারিয়ে থেমেছে ২০৫ রানে। সেই লক্ষ্য তাড়ায় নেমে তারা জয়ী হয়েছেন বড় ব্যবধানে। টাইগারদের বোলিং ইনিংসে শেষ পর্যন্ত সেরা বোলার সাকিবই। প্রথম ওভারে ২১ রান দিলেও বাকি ১২ বলে দিয়েছেন মাত্র ১১ রান। তিন ওভারে ৩৩ রান দিয়ে নিয়েছেন দুটি উইকেট। আর শুরুতে শুরুতে উইকেট এনে দেওয়া তাসকিন ৩ ওভারে দিয়েছেন ৪৬ রান। বাভুমার পর পাননি আর কারও উইকেট। সাকিব আর তাসকিনের বোলিং পারফরম্যান্সও যেন ঐ আবহাওয়ার মতোই। একজনের শুরুটা দারুণ হলেও শেষটা মলিন। অন্যজনের শুরুটা মলিন হলেও শেষ হয়েছে কিছুটা রাঙিয়েই।
