বেশি মৃত্যু ও রোগী শিশু-কিশোর-তরুণ

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২২, ০১:৪৬ এএম

দেশে এ বছর ডেঙ্গু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য। এখন পর্যন্ত যত রোগী পাওয়া গেছে, তার ৬৩ শতাংশের এবং ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ৬১ শতাংশের বয়স ১-২৯ বছরের মধ্যে। তবে বয়সভেদে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে কিশোর-তরুণরা, যা এখন পর্যন্ত মোট রোগীর ২৮ শতাংশ।

এমনকি গত চার বছরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুর সময় বদলেছে। সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাবের বছর ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল আগস্টে, এবার অক্টোবরে। একইভাবে ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ রোগী ছিল আগস্টে, এবার অক্টোবরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডেঙ্গুর ‘হট স্পট’ ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো ডেঙ্গু চিকিৎসার ওপর জোর দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ‘এ বছর অস্বাভাবিক একটি পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। এর একটি কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের বৃষ্টিপাতের সময় পরিবর্তন হয়েছে। যে কারণে এডিস মশার প্রজনন নভেম্বরেও হচ্ছে। আরেকটি কারণ হচ্ছে, যখন ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে, তখন এডিস মশাও বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে যদি দুটি জিনিস বাড়ে, সেটার যেকোনো একটাকে কমিয়ে দিতে হয়। কমিয়ে দিলেই সংক্রমণকে ধীরগতির করা যায়। আমরা কোনোটাই কমাতে পারছি না।’

অবশ্য এ মাসের মাঝামাঝিতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমে আসবে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. ইকরামুল হক। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়াজনিত কারণ এবং মানুষের সচেতনতা কম হওয়ায় ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সিটি করপোরেশন যেভাবে কাজ করছে, আশা করি এ মাসের মাঝামাঝিতে আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব।’

তবে অধ্যাপক ডা. কবিরুল বাশার বলেন, ‘মধ্য নভেম্বরে ডেঙ্গু কমতে শুরু করবে। তবে পুরোপুরি যাবে না, কিছুটা দুর্বল হবে। কারণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা যাচ্ছে না।’

এমন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৭ জন মারা গেছে ও বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৭৫ জন রোগী। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১৭৭ ও ভর্তি হলো ৪৩ হাজার ৯৮২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবারের সংবাদ বুলেটিনে জানানো হয়েছে, নতুন রোগীদের ৪৯৭ জন ঢাকায় এবং ৩৭৮ জন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩ হাজার ২৭০ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে ১ হাজার ৯৮০ জন। অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ২৯০ জন।

মৃত্যুর ৬১% ও রোগীর ৬৩% শিশু-তরুণ : এ বছর অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে যত মানুষ মারা গেছে, তাদের মধ্যে ৬১ শতাংশই শিশু ও তরুণ। অর্থাৎ এদের বয়স ১-৩০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ২৪ শতাংশের বয়স ২০-৩০ বছর, ২১ শতাংশের ১০-২০ বছরের মধ্যে ও ১৬ শতাংশের বয়স ১-১০ বছরের মধ্যে। তবে বয়সভেদে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ৪০-৮০ বছরের মধ্যে, যা মোট মৃত্যুর ৪৭ শতাংশ।

একইভাবে এ বছর যত রোগী পাওয়া গেছে, তাদের ৬৩ শতাংশেরই বয়স ১-২৯ বছরের মধ্যে। সে হিসেবে এ বছর এখনো শিশু ও তরুণরা বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ১৯-২৯ বছরের মধ্যে, যা মোট রোগীর ২৮ শতাংশ। এরপর মোট রোগীর ১৯ শতাংশের বয়স ১০-১৮ বছরের মধ্যে, ১০ শতাংশ ৫-৯ বছর বয়সী ও ১-৪ বছর বয়সী ৬ শতাংশ রোগী।

এ ছাড়া ১৭ শতাংশ রোগীর বয়স ৩০-৩৯ বছর, ১০ শতাংশের ৪০-৫০ বছর, ৫০-৬০ বছর বয়সী রোগী ৭ শতাংশ ও সবচেয়ে কম ৬০-ঊর্ধ্ব বয়সী মানুষ, যা মোট রোগীর ৪ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পর্যালোচনা অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত মোট রোগীর ৬০ শতাংশই পুরুষ ও ৪০ শতাংশ নারী।

ঢাকা উত্তরে বেশি রোগী : গত অক্টোবর পর্যন্ত মোট রোগীর ৪৪ শতাংশই ছিল রাজধানীতে। এর মধ্যে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে, ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ ও দক্ষিণে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ। মোট রোগীর ১৬ শতাংশ ঢাকার বাইরে।

রেড জোন মিরপুর ও উত্তরা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৮টি স্থানকে এবং ঢাকার বাইরে কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকার মধ্যে মিরপুর ও উত্তরা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় রয়েছে কেরানীগঞ্জ, মুগদা ও যাত্রাবাড়ী, তৃতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে ধানম-ি, চতুর্থ অবস্থানে রামপুরা, খিলগাঁও, বাড্ডা ও মোহাম্মদপুর এবং হটস্পটের পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বাসাবো, খিলক্ষেত, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ফার্মগেট, তেজগাঁও, আগারগাঁও, ভাটারা ও নারায়ণগঞ্জ।

২০১৯ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যু আগস্টে, এবার অক্টোবরে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত চার বছরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সময় বদলেছে। সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাবের বছর ২০১৯ সালে মারা গেছে ১৭৯ জন। সে বছর সর্বোচ্চ ৯০ জনের মৃত্যু ছিল আগস্টে। ২০২০ সালে মারা যায় ৭ জন। সর্বোচ্চ ৩ জন করে মারা যায় অক্টোবর ও নভেম্বরে। ২০২১ সালে মারা যায় ১০৫ জন। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল আগস্টে ৩৪ জনের। এ বছর এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১৭৭ জন। এখনো সর্বোচ্চ মৃত্যু অক্টোবরে ৮৬ জনের।

বদলেছে সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাবের সময় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত চার বছরে দেশে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রাদুর্ভাবের সময় বদলেছে। ২০১৯ সালে রোগী ভর্তি হয় ১ লাখ ১ হাজার ৩৫ জন। সে বছর সর্বোচ্চ রোগী ছিল আগস্টে ৫২ হাজার ৬৩৬ জন। এরপর সেপ্টেম্বরে ১৬ হাজার ৮৫৬ ও জুলাইয়ে ১৬ হাজার ২৫৩ জন। সেপ্টেম্বরের পর রোগী কমতে থাকে। ২০২০ সালে রোগী ছিল ১ হাজার ৪০৫ জন। সর্বোচ্চ রোগী ছিল নভেম্বরে ৫৪৬ জন। শেষ মাস ডিসেম্বরে রোগী ছিল ৩২১ জন।

২০২১ সালে অর্থাৎ গত বছর রোগী ছিল ২৮ হাজার ৪২৯ জন। সে বছর সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে সেপ্টেম্বরে ৭ হাজার ৮৪১ জন। এরপর আগস্টে ৭ হাজার ৬৯৮, অক্টোবরে ৫ হাজার ৪৫৮ ও নভেম্বরে ৩ হাজার ৫৬৭ জন রোগী ভর্তি হয়। ডিসেম্বরে রোগী ছিল ১ হাজার ২০৭ জন।

এ বছর এখন পর্যন্ত রোগী পাওয়া গেছে ৪৩ হাজার ৯৮২ জন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী ছিল অক্টোবরে ২১ হাজার ৯৩২, এরপর সেপ্টেম্বরে ৯ হাজার ৯১১, আগস্টে ৩ হাজার ৫২১, জুলাইয়ে ১ হাজার ৫৭১ এবং নভেম্বরে গতকাল পর্যন্ত ৫ হাজার ৯৫৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

হাসপাতালে থাকার গড় সময় সর্বোচ্চ ৩০ দিন, সর্বনিম্ন ৩ : হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের গড় সময় হিসাব করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, রোগীর ৮২ শতাংশকে হাসপাতালে ০-৩ দিন থাকতে হয়েছে। এরপর ২১ শতাংশ রোগীকে ৩-৬ দিন, ১৩ শতাংশকে ৬-৯ দিন ও ৫ শতাংশ রোগীকে ৯-৩০ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে।

ঢাকার বাইরে বেশি রোগী-মৃত্যু কক্সবাজারে : ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও রোগীর বেশিরভাগই কক্সবাজারের। এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৭২৮ জন। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ১৪ হাজার ১৩৮ ও বাংলাদেশি ১ হাজার ৫৯০ জন। মে হিসেবে কক্সবাজারের রোগীর ৯০ শতাংশই রোহিঙ্গা।

সেখানে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৩৪ জন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি ৭ ও বাকি ২৭ জনই রোহিঙ্গা। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৭৯ শতাংশই রোহিঙ্গা। তারা সবাই ক্যাম্পে নিজ বাড়িতে মারা গেছে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে, ২৩ জনের। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) ১৭, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ১২, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৮, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হাসপাতালে ২ জন মারা গেছে।

এশিয়ায় বেশি রোগী ভিয়েতনামে, কম থাইল্যান্ডে : এ বছর এখনো এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে ভিয়েতনামে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫১৮ জন। এরপর ফিলিপাইনে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫০, মালয়েশিয়ায় ৩৭ হাজার ৯৫০, সিঙ্গাপুরে ২৬ হাজার ৭৫৪ ও সবচেয়ে কম থাইল্যান্ডে ২২ হাজার ৩৯৩ জন রোগী পাওয়া গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত