বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) পাঁচ বছর ধরে আশ্রয় শিবির গড়ে তুলে বসবাস করছে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি রোহিঙ্গা। আশ্রয় শিবিরটি ঘেঁষে (পেছনে) মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া ও রাখাইন রাজ্যের একাধিক পাহাড়। এই আশ্রয় শিবিরটিই এখন হয়ে উঠেছে অস্ত্রধারী ভয়ংকর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি। সেখানে বসে পরিকল্পনা করেই কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে কয়েকটি গ্রুপের শতাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী।
পাশাপাশি ইয়াবা, বিদেশি মদ ও অবৈধ অস্ত্রের কারবার এবং সোনা চোরাচালান, মানব পাচার ও ডাকাতির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে ওই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে শূন্যরেখার এই রোহিঙ্গা শিবিরে নজরদারি করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রসীরা। গত সোমবার রাতে সেখানে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও র্যাব সদস্যদের মাদকবিরোধী যৌথ অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে ডিজিএফআই কর্মকর্তা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার রিজুওয়ান রুশদী ও রোহিঙ্গা নারী সাজেদা বেগম নিহত হওয়ার পর এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় আসছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং তমব্রু সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ সাধারণ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ঘুমধুম থেকে উখিয়ার বালুখালী সড়কের তমব্রু বাজার এলাকার কোনারপাড়া থেকে প্রায় ৩০০ মিটার পূর্বে মিয়ানমারের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা শিবির। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কোনারপাড়া থেকে উত্তরপাড়া পর্যন্ত শূন্যরেখার প্রায় ৮০০ মিটারে গড়ে উঠেছে এই রোহিঙ্গা শিবির। সেখানে হাজারখানেক ঝুপড়ি ঘরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার রোহিঙ্গার বসবাস। শূন্যরেখায় এই শিবির হওয়ায় সেখানে নজরদারি করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি কাঁটাতার ঘেঁষে অবস্থান হওয়ায় খুব সহজেই সন্ত্রাসীরা মিয়ানমারে ঢুকতে পারে। যে কারণে সেখানে অবস্থান করা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা থেকে যায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেখানে আস্তানা গড়া অস্ত্রধারী ভয়ংকর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের কারণে শূন্যরেখায় অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরে নজরদারি করতে পারছে না প্রশাসন। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রসীরা।’
একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শূন্যরেখার রোহিঙ্গা শিবিরের নিয়ন্ত্রণ অস্ত্রধারী মাদক কারবারি সিন্ডিকেটের হাতে। সেই সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় সেখানে আস্তানা গড়েছে ভয়ংকর সন্ত্রাসীরা। তাদের মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিক মিয়ানমারের কথিত আল ইয়াকিন বাহিনীর প্রধান আতা উল্লাহ জুনুনী, কুখ্যাত আবদুল হাকিম ডাকাত, জাবু এবং আলোচিত মাস্টার মুন্না অন্যতম। এসব গ্রুপের কয়েকশ অস্ত্রধারী শূন্যরেখার রোহিঙ্গা শিবিরের তিনটি পয়েন্টে আস্তানা গড়েছে। আর এসব বাহিনীর সমন্বয়ক ও মাস্টার মাইন্ড হিসেবে কাজ করেন শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা দোভাষী দিল মোহাম্মদ। এছাড়া কথিত আল ইয়াকিন বাহিনীর প্রধান হিসেবে পরিচিত আতাউল্লাহ জুনুনীর সেকেন্ড ইন কমান্ডার হিসেবে কাজ করছে দিল মোহাম্মদের ছেলে জামাল।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত সোমবার রাতের হামলায় নিহত রোহিঙ্গা নারী সাজেদা বেগমের এক স্বজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যত ধরনের অঘটন ঘটে তার মূল হোতা দিল মোহাম্মদ। এই দিল মোহাম্মদ দোভাষী হওয়ার কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রশাসনের সঙ্গে সখ্য রয়েছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দিল মোহাম্মদ প্রশাসনের অনেক সিদ্ধান্তের তথ্য সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে দেয়। এছাড়া সন্ত্রাসীদের দিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সোমবার রাতে যখন যৌথ বাহিনী রোহিঙ্গা শিবিরে এসে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের গুদামের খবর পায় তখনই বিষয়টি আঁচ করতে পেরে দিল মোহাম্মদ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে যৌথ বাহিনীকে ঘেরাও করে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিচয়পত্র দেখালে দিল মোহাম্মদ সন্ত্রাসীদের ইশারা করে সরে পড়ে। তার ইশারা পেয়ে দিল মোহাম্মদের ছেলে জামালসহ অন্য সন্ত্রাসীরা গুলি করা শুরু করে।’
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে গতকাল বুধবার রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবার রাতের ঘটনা ঘটেছে ক্যাম্পের উত্তর দিকে। আর আমার বাড়ি ক্যাম্পের মাঝখানে। সেদিন ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম না। আমার ছেলে জামালও ঘটনাস্থলে ছিল না এবং জামালের সঙ্গে আতাউল্লাহ জুনুনীর কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই।’
এছাড়া ক্যাম্পে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কোনো আস্তানা নেই বলে তিনি দাবি করলেও সোমবারের হামলার ঘটনায় কারা জড়িত সে বিষেয়ে মুখ খোলেননি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই ক্যাম্পে খুব মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমাদের শূন্যরেখার এই ক্যাম্পে এর আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। সেদিনের ঘটনার জন্য আমরা সব রোহিঙ্গা আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও মর্মাহত। আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওত্তায় আনা হোক।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি টান্টু সাহা বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরটি শূন্যরেখায় অবস্থিত। তাই সেখানে আমাদের নজরদারির সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডিজিএফআই কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনায় এখনো আমরা এজাহার পাইনি। এজাহার পেলেই মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করব।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুলিশ, র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
