ঋণ না নিয়েও আসামি, জামিনেও কাটেনি ভয়

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০২:২৭ এএম

পাবনার ঈশ্বরদীতে ঋণখেলাপি মামলায় গ্রেপ্তার ১২ কৃষকসহ জামিন পেয়েছেন ৩৭ আসামি। গতকাল রবিবার পাবনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. শামসুজ্জামান প্রথমে হাজির হওয়া ১২ কৃষকদের জামিন মঞ্জুর করেন এবং মামলার বাকি আসামিদেরও আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। পলাতক ২৫ আসামি দুপুরে আত্মসমর্পণ করলে তাদেরও জামিন মঞ্জুর করেন বিচারক। জামিন পেয়ে কারামুক্ত হওয়া ও পালিয়ে বেড়ানো কৃষকরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে ঋণ না নিয়ে একজন এবং পরিশোধের পরও অনেকে আসামি হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। অনেকে আছেন ভবিষ্যতে হয়রানিতে পড়ার শঙ্কায়ও। তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের গ্রুপভিত্তিক এ ঋণের সুফল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কৃষকদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহারের দাবিও উঠেছে জোরালোভাবে।

২০১৬ সালে ঈশ্বরদীর ছলিমপুর ইউনিয়নের ভাড়ইমারি গ্রামের ৩৭ প্রান্তিক কৃষকের একটি গ্রুপ বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের পাবনা জেলা কার্যালয় থেকে জনপ্রতি ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেয়। ঋণখেলাপির দায়ে ২০২১ সালে ব্যাংকের পক্ষে তৎকালীন ম্যানেজার সৈয়দ মোজাম্মেল হক মাহমুদ ৩৭ জনের নামে মামলা করেন। চলতি বছর ২৩ নভেম্বর পাবনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে অভিযানে নেমে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। বাকিরা এরপর থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। বিষয়টি সংবাদ প্রকাশিত হলে শুরু হয় সমালোচনা। ঘটনাটি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও। এর মধ্যে গতকাল প্রথমে গ্রেপ্তার হওয়া ১২ কৃষককে জামিন দেয় আদালত। জামিন হওয়া ওই ১২ জন হলেন আলম প্রামাণিক, মাহাতাব মণ্ডল, কিতাব আলী, হান্নান মিয়া, মোহাম্মদ মজনু, মোহাম্মদ আতিয়ার রহমান, আবদুল গণি মণ্ডল, শামীম হোসেন, সামাদ প্রামাণিক, নূর বক্স, মোহাম্মদ আকরাম ও রজব আলী। তারা সবাই প্রান্তিক কৃষক। গতকাল তাদের জামিন আদেশের পরে বাকি ২৫ জন আত্মসমর্পণ করলে তাদেরও জামিন দেয় আদালত।

জামিন পাওয়া কৃষকদের পরিবারের দাবি, ঋণ নেওয়ার পর এক বছরের মধ্যে অধিকাংশ কৃষক তাদের ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছেন। তাদের পাস বই ও জমা রসিদও রয়েছে। অথচ সেই অর্থ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জমা না করে আত্মসাৎ করেছেন। ফলে তাদের হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর ভাড়ইমারি গ্রামের কালাম প্রামাণিকের ছেলে মহির প্রামাণিক বলেন, ‘আমি সমিতি থেকে কোনো ঋণ নিইনি। কোথাও আমার সইও নেই। কীভাবে আমাকে ঋণগ্রহীতা করা হয়েছে জানি না। বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন সবজিচাষি সমবায় সমিতির সভাপতি ও ইউপি সদস্য বিলকিস নাহার। তিনিই এ গ্রামের কৃষকদের এ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এ সমিতির গ্রুপ লিডার।’

মুনসুর প্রামাণিক বলেন, ‘২০১৭ সালে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। পরে কিস্তিতে সমিতির লভ্যাংশসহ ৩৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছি। এতদিন পর শুনছি এ টাকা পরিশোধ হয়নি। গ্রেপ্তার আতঙ্কে আমিও তিন দিন পালিয়ে বেড়িয়েছি। খুব ভয়ে ছিলাম।’

সবজিচাষি সমবায় সমিতির সভাপতি ও ছলিমপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য বিলকিস নাহার বলেন, ‘আমিও এ মামলার আসামি ছিলাম। আমার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে ছিলাম। কিস্তি যারা দিয়েছেন তাদের জমা রসিদ দিয়েছি। যারা কিস্তি দেননি তারাও আমাকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করছেন।’

তিনি জানান, ১৬ লাখ টাকা ঋণের বরাদ্দ ছিল। এ ঋণ ৩৭ জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে কেউ কম, আবার কেউ বেশি করে নেন। সাতজন বাদে ঋণের টাকা অনেকেই পরিশোধ করেছেন। আবার কারও কারও ২-৫ হাজার বাকি আছে। তবে সাতজন কৃষক টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। গ্রুপভিত্তিক ঋণের কারণে সবার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

মামলার বাদী সৈয়দ মোজাম্মেল হক মাহমুদ বলেন, ‘কৃষকরা ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলা করা হয়। খেলাপি ঋণ আদায়ে এটা চলমান প্রক্রিয়া। আমরা আমাদের অফিশিয়াল ব্যবস্থা নিয়েছি। তারা তাদের আইনগত সহায়তা পেয়েছেন।’

আদালতে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাইদুর রহমান সুমন, কাজী সাজ্জাদ ইকবাল লিটন ও মইনুল ইসলাম মোহন। তারা জানান, মামলার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে স্থানীয় প্রশাসন। ভুক্তভোগী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।

পুলিশ সুপার আকবর আলী মুন্সি বলেন, ‘জামিন হওয়ার পর কৃষকদের নিয়ে আমি বসেছি। তাদের থেকে সবকিছু শুনেছি। তারা যাতে হয়রানির শিকার না হন সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। কৃষকদের বিরুদ্ধে কেন মামলা হয়েছে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। আমরা তদন্তের কাজ শুরু করেছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত