মেট্রোরেল বাঙালির গৌরব। মেট্রোরেল উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত হয়েছে। এ কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সব বাধা মোকাবিলা করে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট দেশ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন তিনি। দেশের প্রথম মেট্রোরেলের ফলক উন্মোচনের পর গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
উত্তরার দিয়াবাড়ীতে দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬-এর আংশিক উদ্বোধন করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। আর মেট্রোরেল চালুর মধ্য দিয়ে দেশ বৈদ্যুতিক, দূরনিয়ন্ত্রিত এবং দ্রুততম যোগাযোগের যুগে প্রবেশ করেছে।
বেলা ১১টায় উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের ‘সি’ ব্লকের মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের যোগাযোগব্যবস্থার এ বৃহৎ অবকাঠামোর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তার ছোট বোন শেখ রেহানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি সারা বিশ্বে মর্যাদা পেয়েছে। আজ আমরা আরেকটি গৌরবের পালক বাংলাদেশের জনগণের মাথার মুকুটে সংযোজিত করলাম।
সরকারপ্রধান বলেন, কাজ করতে গেলে সাহসের প্রয়োজন হয়, সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। আওয়ামী লীগ সরকারে এসে প্রতিটি কাজ পরিকল্পনা করে সম্পন্ন করেছে। ফলে মাত্র ১৪ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, মেট্রোরেল উদ্বোধনের ফলে একসঙ্গে প্রযুক্তিতে চারটি মাইলফলক ছুঁলো বাংলাদেশ। প্রথমত, মেট্রোরেল নিজেই একটি মাইলফলক। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ প্রথম বৈদ্যুতিক যানের যুগে প্রবেশ করল। তৃতীয়ত, ডিজিটাল রিমোট-কন্ট্রোলড যান এটি, যা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি ধাপ। চতুর্থত, বাংলাদেশ দ্রুতগতির যানের যুগে প্রবেশ করল। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলবে মেট্রোরেল।
শেখ হাসিনা বলেন, মেট্রোরেল পরিচালনায় অন্য দেশের ওপর নির্ভরতা থাকবে না। এর পরিচালনায় আমরা নিজেরাই স্মার্ট নাগরিক তৈরি করব। এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব।
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং বাংলাদেশে জাইকার প্রধান প্রতিনিধি ইচিগুচি এবং বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি বক্তব্য দেন।
অন্যদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রওশন আরা মান্নান এমপি মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী স্বাগত বক্তব্য দেন এবং ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক মেট্রোরেলের অগ্রগতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন।
প্রধানমন্ত্রী দিনটি উপলক্ষে অনুষ্ঠানে স্মারক ডাকটিকিট, ৫০ টাকার স্মারক নোট, খাম ও ডেটা কার্ড অবমুক্ত করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী টিকিট কাউন্টার থেকে ই-টিকিট কিনে মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রী হন। শেখ রেহানাও টিকিট কিনে প্রথম যাত্রায় তার সঙ্গী হন। প্রধানমন্ত্রী স্টেশনে একটি গাছের চারাও রোপণ করেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সভাপতিম-লীর সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সিনিয়র নেতা, পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি ও কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি আধুনিক একটি পরিবহনব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু রাখতে আমাদের প্রকৌশলীদের ট্রেনিং অব্যাহত থাকবে। এর নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট লোকবলের এবং ডিএমটিসিএলের অধীনে ১২ হাজার গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলী ও মাঠ প্রকৌশলীর কর্মসংস্থান হবে। ফলে শুধু বেকারত্বই দূর হবে না, দক্ষ জনশক্তিও গড়ে উঠবে। এর ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে ওঠার মাধ্যমে আরও কর্মসংস্থান হবে। মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিদেশি শক্তির ওপর বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হবে না। বিদ্যুৎচালিত মেট্রোরেলের শব্দ ও কম্পন দূষণমাত্রা মানদ--সীমার অনেক নিচে থাকবে। তিনি বলেন, মেট্রোরেলে বছরে ২ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমবে।
মেট্রোরেল নির্মাণকালীন সহযোগিতার জন্য শেখ হাসিনা এলাকাবাসীকে ধন্যবাদ জানান এবং নির্মাণকালীন নানা জনদুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। মেট্রোরেল উদ্বোধনে সক্ষম হওয়ায় তিনি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সবাইকে এবং জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান।
২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে বিয়োগান্তক ঘটনায় এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এ কর্মরত সাত জাপানি পরামর্শক নিহত হওয়ায় তাদের স্মরণ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। নিহত জাপানিদের স্মরণে বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের যৌথ উদ্যোগে উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মেট্রোরেল প্রদর্শনী ও তথ্যকেন্দ্রে স্মৃতিস্মারক স্থাপন করা হয়েছে, যা পরে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এর আন্তঃলাইন সংযোগ স্টেশনে স্থানান্তর করা হবে বলে জানান তিনি। মেট্রোরেলের সুরক্ষায় সবাইকে যতœবান হওয়ার আবেদন জানান সরকারপ্রধান।
