মুমিন যেসব কারণে জাহান্নামে যাবে

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:২৯ পিএম

আল্লাহতায়ালা কেয়ামত দিবসে পৃথিবীর সব মানুষকে মৌলিকভাবে চার ভাগে বিভক্ত করে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। প্রথমত, যারা পৃথিবীর জীবনে মোটেও ইমান গ্রহণ করেনি। যতই ভালো কাজ করুক না কেন তারা হিসাব ছাড়াই জাহান্নামে যাবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘বলুন! আমি তোমাদের কী সংবাদ দেবনিজেদের আমলের ক্ষেত্রে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারা সেসব লোক, দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা সাধনা ব্যর্থ হয়ে গেছে আর তারা নিজেরা মনে করছে যে, তারা সঠিক কাজই করছে। তারা হলো সেসব লোক, যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শন ও তার সঙ্গে সাক্ষাৎকে অমান্য করে। যার ফলে তাদের যাবতীয় আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। কিয়ামতের দিন আমি তাদের (কাজের) জন্য কোনো ওজন কায়েম করব না (তাদের এসব আমল ওজনযোগ্য গণ্য হবে না)। এটাই তাদের প্রতিফল জাহান্নাম। কারণ তারা কুফরি করেছে আর আমার নিদর্শন ও রাসুলদের হাসি-তামাশার বিষয় বানিয়েছে।’সুরা কাহাফ : ১০৩-১০৬

দ্বিতীয়ত, যারা পৃথিবীতে ইমান গ্রহণ করেছিল। তাদের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।সহিহ বোখারি : ৫৭৫২

তৃতীয়ত, যারা ইমান গ্রহণ করেছিল এবং দুনিয়ার জীবনে নেক ও পাপ উভয়টিই করেছে তবে তাদেরও আল্লাহতায়ালার দয়া বা কোনো নবী বা শহীদ কিংবা নাবালক শিশু অথবা রোজা বা নেককার মানুষ কিংবা কোরআন এবং বিভিন্ন নেক আমলের সুপারিশের মাধ্যমে জান্নাত দেওয়া হবে।

চতুর্থত, যারা ইমান এনেছিল বটে এমন কিছু মারাত্মক গোনাহ দুনিয়ার জীবনে করেছিল। তাদের ভাগ্যে আল্লাহর দয়া বা কোনো সুপারিশ না জুটার কারণে তাদের সরাসরি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে হবে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা ভোগ করতে হবে। যেসব গোনাহের কারণে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে সে গোনাহসমূহের কয়েকটি নিম্নরূপ

১. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। যারা অন্যায়ভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে তাদের যতই নেক আমল থাকুক না কেন; প্রথমে তাদের জাহান্নামে যেতেই হবে। এ সম্পর্কে হজরত যুবাইর ইবনু মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করিম (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।সহিহ বোখারি : ৫৯৮৪

অন্য বর্ণনায় হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রহিম অর্থাৎ আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক আল্লাহর আরশের সঙ্গে ঝুলন্ত রয়েছে। সে বলে, যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে আল্লাহ তার সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আল্লাহ তার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করবেন।সহিহ মুসলিম : ৬৪১৩

২. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া। এ সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।সহিহ মুসলিম : ৭৬

অন্য আরেক হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! অমুক মহিলা বেশি বেশি (নফল) নামাজ পড়ে এবং রোজা রাখে ও দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জবান দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? তিনি বললেন, সে দোজখে যাবে। লোকটি আবার বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! অমুক মহিলা অল্প (নফল) নামাজ পড়ে ও রোজা রাখে এবং দান-খয়রাত করে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সে নিজ জবান দ্বারা (অসভ্য কথা বলে বা গালি দিয়ে) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? তিনি বললেন, সে বেহেশতে যাবে।মুসনাদে আহমাদ : ৯৬৭৫

এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, প্রতিবেশী যে ধর্মের বা বর্ণেরই হোক না কেন কোনোভাবেই তাকে কষ্ট দেওয়া জায়েজ নয়।

৩. অহংকার করা। এটা এমন একটি মারাত্মক গোনাহ, যা আমলনামায় থাকলে যতই নেকি থাকুক আগে জাহান্নামে যেতে হবে। আমাদের চিরচেনা শত্রু ইবলিস একমাত্র অহংকারের জন্যই অভিশপ্ত হয়েছিল। এ বিষয়ে কোরআন মজিদে একাধিক আয়াত রয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোনো উদ্যত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’সুরা লোকমান : ১৮

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা অহংকারে আমার ইবাদতে বিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।’সুরা গাফির : ৬০

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘মহান আল্লাহ বলেন, অহংকার হলো আমার চাদর এবং মহত্ত্ব হলো আমার লুঙ্গি। যে কেউ এর কোনো একটি নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া করবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।’সুনানে আবু দাউদ : ৪০৯০

৪. অধীনস্থদের হক আদায় না করা ও খেয়ানত করা। আমরা প্রত্যেকেই স্বীয় জায়গা থেকে দায়িত্বশীল এবং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সচেতন থাকা আবশ্যক যেন কারও হকের ব্যাপারে খেয়ানত না হয়ে যায়। কেননা হাদিসে এসেছে হজরত হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, আমরা মাকিল ইবনে ইয়াসারের কাছে তার সেবা-শুশ্রƒষার জন্য আসলাম। এ সময় উবাইদুল্লাহ প্রবেশ করল। তখন মাকিল (রা.) বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি হাদিস বর্ণনা করে শোনাব, যা আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করল আর তার মৃত্যু হলো এ অবস্থায় যে, সে ছিল খেয়ানাতকারী। তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।সহিহ বোখারি : ৭১৫১

এ ছাড়া আরও বহু গোনাহ এমন রয়েছে, যেগুলার দ্বারা মানুষ মুমিন হওয়া সত্ত্বেও সর্বাগ্রে জান্নাতে না গিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত