দেশে আমদানি নিষিদ্ধ হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন (টিকা) চোরাই পথে এনে সেগুলো ভেঙে পানি মিশিয়ে জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধক নকল টিকা তৈরি করেছে একটি চক্র। গত দুই বছরে চক্রটি দেশে চিকিৎসা সেবাদানকারী বেসরকারি কিছু সংস্থার মাধ্যমে ঢাকা ও পাশর্^বর্তী এলাকার দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্প করে ছয় হাজারের বেশি নারীকে সেই টিকা দিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশসহ (ডিএমপি) একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নকল টিকা দেওয়ার চক্রের ৫ সদস্যকে গত বুধবার গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, নকল এই টিকার অন্যতম হোতা ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক হিমেল। তিনি পলাতক রয়েছেন। হিমেলের সঙ্গে গ্রেপ্তার শিপনের নকল টিকা তৈরির কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে। অভিযোগ ওঠার পর হিমেলকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কথা বলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যকরী কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতারক চক্রটিকে সহায়তাকারী বেসরকারি চিকিৎসা সেবা দাতা সংস্থা ও হাসপাতালের ডজনখানেক মালিক জানতে চাইলে ডিবি তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. আনিচ উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চক্রটি প্রথমে জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধক টিকা ‘সারভারিক্স টিএম’-এর অ্যাম্পুলে পানি মিশিয়ে নারীদের শরীরে দিয়েছে। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লে পরে দেশে আমদানি নিষিদ্ধ হেপাটাইটিস-বির টিকা ভেঙে তাতে পানি মিশিয়ে ‘সারভারিক্স টিএম’-এর অ্যাম্পুলে ঢুকিয়ে প্রয়োগ করা শুরু করে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচজনকে দুই দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই নজরদারিতে রয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলো সাইফুল ইসলাম শিপন (২৬), ফয়সাল আহমেদ (৩২), আল আমিন (৩৪), নুরুজ্জামান সাগর (২৪) ও আতিকুল ইসলাম (১৯)।
নকল টিকার বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরও। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। গতকাল শনিবারও অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজে অভিযান চালিয়েছি। তবে হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যারা নকল টিকার সঙ্গে জড়িত তারা আত্মগোপনে চলে গেছে।’ অভিযানের খবর পেয়ে আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ থেকে দুই বস্তা নকল টিকা সরিয়ে ফেলার কথা জানান তিনি।
যারা নকল টিকা নিয়েছেন তাদের একটি তালিকা পেয়েছে ডিবির তদন্তকারী দল। সেই তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা ও পার্শ¦বর্তী ১৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্প করে নারীদের দেওয়া হয়েছে জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধক নকল টিকা। স্থানীয়দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা ও ছাত্রীরাও নিয়েছেন নকল ওই টিকা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম রাজধানীর বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল ক্যাম্প থেকে টিকা নিয়েছেন শতাধিক নারী, পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫৪ নারী, মেরিট পাবলিক স্কুল থেকে ১৮ জন।
এ ছাড়া বছিলা চাঁদ উদ্যান স্কুল, মানিকনগর স্কুল, প্রগতি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, প্রাইম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, মানিকদি সরকারি প্রাথমকি বিদ্যালয়, নর্থ সিটি পাবলিক স্কুল রয়েছে এই তালিকায়।
৩৫০ টাকা মূল্যের হেপাটাইটিস-বির টিকা ভেঙে চক্রটি নকল টিকা বানিয়ে বিক্রি করছে ২৫ হাজার টাকায়। এভাবে কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছে তারা। নকল এই টিকা নিয়ে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন নারীরা।
চিকিৎসা সেবাদানকারী বেসরকারি একটি সংস্থার মাধ্যমে জরায়ু ক্যানসারের টিকার দুই ডোজ নিয়েছেন বনশ্রী এলাকার এক গৃহবধূ। তিনি দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। টিকা নেওয়ার পর তার শরীরে জ্বরের পাশাপাশি প্রচ- ব্যথাও অনুভব করেন। টিকার তৃতীয় ডোজ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ওই গৃহবধূ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম টিকা নিলে এমনিতেই শরীর খারাপ লাগে। এখন আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম টিকাটি ভেজাল।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যদি এই টিকা নকল হয় তাহলে সরকারের যাদের দায়িত্ব ছিল এই টিকা দেওয়া কার্যক্রম দেখভাল করা, তাদের শাস্তি দাবি করছি।’
আরেক ভুক্তভোগী এক স্কুল শিক্ষিকা জানান, টিকা নেওয়ার পর তার শরীর ফুলে গিয়েছিল। পরে এমনিতেই ঠিক হয়ে গেছে।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে তিন বছর ধরে জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধক টিকা সারভারিক্স আমদানি হয় না। এ ছাড়া হেপাটাইটিস-বির টিকা ‘জেনেভ্যাক বি’ বাংলাদেশে আমদানি নিষিদ্ধ। এরপরও চক্রটি পাশর্^বর্তী দেশ ভারত থেকে চোরাই পথে বাংলাদেশে জেনেভ্যাক বি নিয়ে আসছে। বেশি আসছে বাংলাদেশের সিলেটের তামাবিল সীমান্ত দিয়ে।
প্রতারক চক্র একটি জেনেভ্যাক বি ভেঙে ১০টি নকল অ্যাম্পুলে ভরে জরায়ু ক্যানসারের ‘টিকা’ হিসেবে সরবরাহ করছে। যার একেকটি অ্যাম্পুলের দাম আড়াই হাজার টাকা। চক্রটি টিকা বাজারজাতকরণে বেসরকারি কিছু সংস্থার সহায়তা নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ডা. এ আর খান ফাউন্ডেশন, আল নূর ফাউন্ডেশন ও পপুলার ভ্যাকসিনেশন সেন্টার অন্যতম।
ডিবির একটি সূত্র বলছে, এসব ফাউন্ডেশনের শীর্ষ পযায়ের অন্তত ১২ জনকে নজরদারিতে রেখেছে ডিবি।
চক্রটির দেওয়া টিকা কার্ডে লেখা এ আর খান ফাউন্ডেশনের ফোন নম্বরে ফোন করে বন্ধ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আল-নূর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক এ এস ফারহান গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া শিপন একসময় আল-নূর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক ছিলেন। তাকে নানা অপকর্মের কারণে মারধর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি নকল টিকা দিয়ে থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়টি আমাদের জানা নেই।’
জানতে চাইলে ডিএমপির ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে জরায়ু ক্যানসারের প্রতিরোধমূলক টিকার নাম দিয়ে প্রতারণা করেছে। এদের সহায়তা করেছে কিছু কোম্পানি।’
তিনি বলেন, চক্রের মূল টার্গেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ জড়িত কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
