চলচ্চিত্র সমালোচনা

জন্মান্ধ জোনাকিগুচ্ছ অথবা ‘মায়ার জঞ্জাল’

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৩, ০১:০৪ এএম

পর্দায় ফুটে ওঠে জলাশয়ে গলা ডুবিয়ে ভেসে চলা কতিপয় পানকৌড়ির জলকেলি। না, এমত দৃশ্যের কাব্য করতে ‘কবি’ এই সিনেমা নির্মাণ করেননি। কবি, এই সিনেমার পরিচালক, ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরির ডাক নাম। জলাশয়ের ওপাশের শহর-কলকাতার সারিসারি উঁচু বাসভবনের খোপের ভেতরের মানুষজন, গলিঘুপচির বিব্রত নাগরিক মন নিয়েই এখানে তার কারবার। শুরুর দৃশ্যটা রচিত হয়েছে এই সিনেমা-গল্পের এক মূল চারিত্র সত্য’কে পরিচয় করিয়ে দিতে। সত্য (সোহেল মন্ডল) চোর, একটা রিয়েল এস্টেট সিন্ডিকেটের মাস্তান সে। সত্য’র যিনি বস, তিনি সিন্ডিকেটের লিডার। মধ্যাহ্নভোজের একটি পিকনিক সুলভ দৃশ্যটি ঘটছে ওই ঝিলের পাড়ে। ইউটিউবে/ টিকটকে ফিচলেমির ভিডিও দেখতে দেখতে মাছভাত খাচ্ছেন বস। বাইকচুরির অপরাধী সত্যকে থানা থেকে ছাড়িয়ে এনেছে ফিল্ড লেভেলের লিডাররা। এঁটো হাতে চড়-থাপ্পড় মেরে বস তার নিজের অবস্থান জানান দিয়ে বিদায় নেন এই ছবি থেকে। থানায় পূজা-অর্চণা সেরে পূজারীর সঙ্গে আমরা পৌঁছে যাই একটি বেশ্যাবাড়িতে। সত্য’র মন বাঁধা আছে ওইখানে বিউটির কাছে। এই বিউটি সরকারের আবার আরেকটি পরিচয় আছে, সে বাংলাদেশের সাতক্ষীরার মেয়ে সরলা সরকার (চান্দ্রেয়ী ঘোষ)। বছর ছয়েক আগে স্বামী তাকে এদেশে এনে বেচে দিয়েছে। সরলা সত্যকে বিনে পয়সার শরীর পেতে দেয়, সত্য তাকে এদেশের আধারকার্ড-পরিচয়পত্র জুটিয়ে দেয়। শরীর ও স্বার্থের এইসব লেনদেনের মধ্যে প্রেমের রেশটুকুও আন্দাজ করি। যদিও তা সংশয়ে, সন্দেহে দোদুল্যমান। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি ছোটগল্প আবলম্বনে ‘মায়ার জঞ্জাল’ নামের সিনেমার একটি গল্প ‘বিষাক্ত প্রেম’-এর চরিত্র এই সিনেমার সত্য ও সরলা।  বাংলাদেশের সোহেল ম-ল আর পশ্চিমবঙ্গের চান্দ্রেয়ী ঘোষ দু’জনেই বেশ ভালো চরিত্রায়ণ করেছেন। বলে রাখা ভালো এডাপটেশনের বেলায় সাহিত্যের চরিত্র, মেজাজ, প্লট লাইন-বাই-লাইন সিনেমায় নেই, থাকবার প্রয়োজনও নেই। অপর গল্পটি ‘সুবালা।’ সিনেমার চিত্রনাট্যে গল্পদুটি যেমন মিলেমিশে একাকার, তেমনি নতুন নতুন চরিত্র ও জায়গাজমিন এসে হাজির হয়েছে।

বলি, এই সিনেমার প্যারালাল স্টোরির অপর চরিত্র ‘সোমা’র কথা, তার জীবনসঙ্গীর কথা, সন্তান ও পরিবারের কথা। বছর খানেক আগে প্রযোজক বন্ধুর সঙ্গ করবার কারণে ‘মায়ার জঞ্জাল’ দেখবার সুযোগ হয়েছিল, তখন তাকে আমি সিনেমাটা নিয়ে দু-চার কথা লিখবার আগ্রহ নিজেই প্রকাশ করেছিলাম। প্রথমবার সিনেমাটা দেখে আমার সমস্ত কৌতূহল গিয়ে হাজির হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার এই সিনেমার ওই বিশেষ চরিত্র ‘সোমা’ ও তার অভিনয় শিল্পীর দিকে, তিনি বাংলাদেশের অপি করিম। এর আগে তার কোনো সিনেমা আমি দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। মাতাল- গোঁয়াড় স্বামী চান্দুর চাকরি চলে গেছে। সংসার চালানোই দায়। তবু ছেলেকে মাস্টার রেখে গান শেখানো চাই। ইংরেজি ইশকুলে পাঠাবেন বলে স্বামীর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সোমা ‘পরের ঘরে বাসন মাজতে যাবে।’ মাসে হাজার দশেক টাকার মাইনেতে হাউজ কিপিংয়ের চাকরি, টুকটাক রান্নাবান্নার সঙ্গে বাড়ির বয়স্ক ভদ্রলোকের দেখভাল করা। ভারতে এমন ঘটনা প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশের বিরল। কিন্তু জানি, যা দিনকাল পড়েছে আমার দেশেও সোমাকে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ইংরেজি ইশকুলে পড়তে পাঠাতে পরের ঘরে ‘কাজের বুয়া’ হয়ে হাজির হতে হবে। এখনই হয়। ইংরেজি স্কুলে নয়, বাংলা স্কুলে কিংবা মাদ্রাসায় সন্তানকে পাঠিয়ে তারা আমাদের ঘরে ঘরে হাজির হন। একটু আগেও যে ঊর্ধ্বকমার ভেতরে যে শব্দবন্ধে কাজের বুয়া বলে যাকে আমরা জানি ‘মায়ার জঞ্জাল’-এ তিনি সোমা। সিনেমাটি ভারতে বাংলাদেশে একসঙ্গে প্রদর্শিত হচ্ছে এই মুহূর্তে। কিন্তু দুই দেশের দর্শকের মনোভঙ্গি ভিন্ন। এই ভিন্নতার গল্পই আমি বলতে চাই। এই দেশে তথাকথিত ‘কাজের বুয়া’ সোমাদের কোনো ব্যক্তিগত জীবন নজর করার কোনো রীতি নেই বাড়ির মালিক-মালকিনদের। তাদের স্বামী-সন্তানদের খোঁজখবর করবার দায়ও নেই। সে আসবে, আমার ঘর সাফাই রান্নাবান্না করতে বান্দিগিরি করতে। গৃহকর্মীদের আমরা নাটক-সিনেমায় গার্হস্থ্য বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। পরিষ্কার করে বললে তারা হবেন বোকার হদ্দ, নয়তো কমেডিয়ান। এইক্ষেত্রে সোমার সংসার আমাদের নিম্ন-মধ্যবিত্তের আপন সংসার। সোমার বর চান্দু শুধু শিক্ষিতই নয়, রাজনীতি সচেতন, এলাকার বাম সংগঠনেও তার যাওয়া-আসা। স্ত্রীকে পরের ঘরে পাঠাতে তার পৌরুষে লাগবে, ভাতের থালা ছুড়ে ফেলবে, স্ত্রীকে গতর দেখিয়ে তার চেয়ে বেশি বেতনের চাকরি পাওয়ার খোঁটা দিয়ে মোক্ষম ইঙ্গিত করবে। আবার আলসেমি-গোঁয়ার্তুমির কারণে হারানো চাকরিটা ফিরে পেতে মেগাস্টোরের কর্তাব্যক্তির কাছে নিজের ইগো ধসিয়ে পাবলিক প্লেসে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখব। ঋত্বিক চক্রবর্তী এই চান্দুর ভূমিকায় দুর্দান্ত। অতঃপর সত্যবাহিনীর কাছে ড্রাগস বিক্রির ব্যবসার ‘বিহারী বুদ্ধিতে’ চান্দু ফেঁসে যাবে। তার আগে একটি স্বপ্নের কথা‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা সত্যি!’, মাসে দশ-বিশ হাজার ইনকাম হবে। তুমি ওই বাড়ির কাজটা এবার ছাড়ো। ছেলে ভালো করে খেতে পারবে, গান শিখতে পারবে, ইংরেজি ইশকুলে পড়বে। এরপর কালীপূজার তান্ডব উৎসবের রাত। আতশবাজি-পটকার আওয়াজের মধ্যেও মশারির নিচে ক্লান্ত ঘুমন্ত চান্দু নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। স্বামীর মুখের দিকে সোমার মায়াবী চোখে চেয়ে থাকা, এতটুকু স্পর্শের আদর। তবে কিছুটা মায়া রহিয়া গেল? শুধুমাত্র এই কারণেই এই ছবিটি আমার দেশের দর্শকদের আমি দেখতে বলব। ভদ্রলোকি চোখে ‘নন-এক্সিসটেন্ট’ এই মানুষগুলার কোনো আশা-উচ্চাশা যে থাকতে পারে তা আমরা ভাবতেও পারি না। ইহা আমাদের মুসলমানি অভিজ্ঞতা ‘বান্দি’ বললে আপনারা যাকে বুঝবেন। নিজে দেখে নিয়ে পরখ করে নিতে পারেন আমাদের দেশজ বাস্তবতা।

এবার আসা যাক সিনেমার কিছু টুকিটাকি দৃশ্যে। যে বুড়োর পরিচর্যার জন্য সোমার এই বড়লোকের ফ্ল্যাটবাড়িতে আসা ওই বুড়ো ভদ্রলোকের চরিত্র সহজ এবং সুন্দর। যুবতী মেয়েদের পরের ঘরে রাত্রিযাপনের যে দুর্যোগ তা এই ছবিতে অনুপস্থিত। সংবেদশীল শিক্ষিত ভদ্রলোক মর্নিং ওয়াকের নামে পুত্রবধূকে লুকিয়ে সোমাকে নিয়ে রাস্তার লুচি খাওয়ার দৃশ্যটি অনবদ্য। দিনদুনিয়ার অনাচারের মধ্যে তিনি যখন স্টিফেন হকিংয়ের রেফারেন্স দিয়ে বলেন এই পৃথিবী বেশিদিন টিকবে না, সোমার অবাক বিস্মিত কথা, ‘ওরা মন্দলোক, ওদের কথা শুনবেন না।’ বোকার স্বর্গে বাস করা আশাবাদী সোমাকে বড় আপন লাগে। এত যে ক্লান্ত তার মুখচ্ছবি, তার মধ্যে ওই শান্ত, ভুবনমোহিনী হাসিটুকুতে মায়া রহিয়া গেল। সত্যর জন্মদিনে মায়ের ফোনে ঘুমঘোরে অবহেলামূলক ওই কথা কয়টি কিংবা পানের ভেতর ড্রাগসের মিশ্রণের বেশিবেশিতে ঘাবড়ে যাওয়া সত্য সরলাকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টায় পায়ের নিচে মালিশ করতে থাকার ব্যাকুল দৃশ্য। আরও দুটি দৃশ্য বেশ মনে পড়ছে, সত্য নিজের জন্মদিনে সরলার সঙ্গে দেখা করতে এসে দেখে সরলার ঘরে খদ্দের। সরলার সহকর্মী বন্ধু মেয়েটি কী সুন্দর ভাবেই না সত্যকে চিংড়িমাছ-ভাত খাইয়ে আপ্যায়ন করে তাকে। ওই মেয়েটির অভিনয় দুর্দান্ত। ভীষণ জ্যান্ত দুইজনের ওই মুহূর্তটি ডায়ালগে, পাশের ঘরের যৌনশব্দে, নৈঃশব্দে, পরস্পরের চাহনিতে। সরলার একজন রসিক খদ্দের যিনি মাছের কারবারি (ব্রাত্য বসু) শিংমাছ নিয়ে তার আতিশয্যের গল্প। মাছগুলো কিলবিল করছে, কর্মচারীকে খলবল করে বলে চলেছেন ছোটবেলার গল্প, তিনদিনের জ্বরের পরে মায়ের হাতে পটল-শিংয়ের ঝোলের জন্য তার হাহাকারের গল্প। মাতৃঅন্তঃপ্রাণ মানুষটির প্রগলভতা একটু বেশি বেশি। যাইহোক, যে চরিত্রের অনন্যতা সিনেমাটিকে মায়ার জালে বেঁধে রাখে সে জঞ্জাল কুড়ানো এক পাগল। ছবির প্রায় শুরু থেকে শেষ অব্দি নিঃশব্দেই তার আনাগোনা এবং প্রায় প্রতিটি প্রধান চরিত্রের সঙ্গেই তাকে আমরা ফ্রেমবন্দি হতে দেখি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা’ অন্যসব চরিত্রের অগোচরেই তার বিচরণ।

অল্প পরিসরে টুকিটাকি গল্পগুজব তো হলো, এবার সিনেমা-দর্শনের অভিজ্ঞতা নিয়ে দু’চার কথা বলি। এই সিনেমার প্রযোজক ও পরিচালক দুজনেই আমার বন্ধুস্থানীয়। সমালোচকই চলচ্চিত্রকারের প্রকৃত বন্ধু জেনে তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত অনুভূতিমালা হাজির করা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প দুটির অ্যাডাপটেশন বেশ জুৎসই হলেও তার চিত্রায়ণ এতটাই ব্যাকরণসিদ্ধ যে আরও গভীরে মনঃসংযোগে আগ্রহী করে তোলে না। শব্দায়োজন, সম্পাদনার ছন্দেও বিশেষ কোনো মাহেন্দ্রক্ষণ তৈরি করছে না দেখে কষ্ট পেয়েছি। হয়তো আমি নিজে একটু ড্রামাপ্রবণ মানুষ, তবু বলি সিনেমায় প্রাণের অভাবটা রয়েই গেল। তারপরও এই অভাবের সংসারে বন্ধুদের হলে গিয়ে ছবিটা দেখতে বলি, ঘরের সোমাদের নিয়ে আপনারা কৌতূহলী না হলে আর কে হবে? আর হ্যাঁ, ‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমায় ওয়াহিদা মল্লিক জলি আপার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ! মায়া পড়ে আছে জঞ্জাল কুড়ানো মানুষটার জন্যও। জয়গুরু।

 ২ মার্চ, ২০২৩।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত