ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলায় উচ্চ আদালতে আগাম জামিন পেয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তার করা আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল রবিবার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ ছয় সপ্তাহ জামিনের এই আদেশ দেয়। গতকাল সকালে মতিউর রহমানের পক্ষে জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার। আদালত বেলা ৩টায় শুনানির জন্য সময় নির্ধারণ করে। শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবনের নির্ধারিত স্থান থেকে ভার্চুয়ালি আদালতে হাজির হন মতিউর রহমান। তার পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, জেড আই খান পান্না, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও প্রশান্ত কুমার কর্মকার। রাষ্ট্রপক্ষে জামিনের বিরোধিতা করে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাছান চৌধুরী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী। আইনজীবীরা বলেন, ছয় সপ্তাহের মধ্যে মতিউর রহমানকে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে প্রথম আলো অনলাইনের একটি প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ হয়। এতে দিনমজুর জাকির হোসেনের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি ‘ফটোকার্ড’ তৈরি করা হয়। যাতে ‘পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব’ এমন উদ্ধৃতি দেখা যায়। উদ্ধৃতিদাতা হিসেবে দিনমজুর জাকির হোসেনের নাম থাকলেও ছবিটি ছিল এক শিশুর। ফেসবুকে ওই পোস্টটি দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে তা প্রত্যাহার করে প্রথম আলো। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সংশোধনী দিয়ে প্রতিবেদনটি অনলাইনে প্রকাশ করে তারা।
এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হেয়প্রতিপন্ন করে মিথ্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশের অভিযোগে গত ২৯ মার্চ রাতে রাজধানীর রমনা থানায় ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করেন আইনজীবী আবদুল মালেক (মশিউর মালেক)। এতে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং পত্রিকাটির সাভারে কর্মরত নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামান শামস ও তার সহযোগী ক্যামেরাম্যানসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করেন বাদী। মামলাটির এজাহারে নাম উল্লেখ করা অপর আসামি শামস গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাকে গত বুধবার ভোরে সিআইডি সদস্য পরিচয়ে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পর ৩০ মার্চ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
প্রথম আলো সম্পাদকের জামিন শুনানিতে আইনজীবী ফিদা এম কামাল বলেন, ‘ওই প্রতিবেদনে শিশুটির যে ছবি ছাপা হয়েছে তা জাকির নয়, সবুজের। জাকির নামে একজন দিনমজুরের বক্তব্য এসেছে প্রতিবেদনে। পরে ভুলের সংশোধনীও দিয়েছে প্রথম আলো। কিন্তু ৭১ টিভির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ ধরনের হয়রানিমূলক মামলা কি পলিটিক্যাল মোটিভেটেড নয়?’
বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক তখন এজাহার থেকে পড়তে থাকেন। বিচারক বলেন, ‘আমরা যতদূর জানি প্রথম আলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে। তাদের সেøাগান হচ্ছে সত্যের সন্ধানে। এখন আপনারা (প্রথম আলো) যদি তথ্য প্রকাশে এ ধরনের ভুল করেন তাহলে কীভাবে হবে?’ এখানে ইনফরমেন্ট (বাদী) কীভাবে সংক্ষুব্ধ হলেন সে প্রশ্ন তোলে হাইকোর্ট।
তখন ফিদা এম কামাল বলেন, ‘আমরা জানি না। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে এখন নতুন রূপ দিয়ে ব্যবহার হচ্ছে।’
একপর্যায়ে অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না জামিনের আরজি জানিয়ে আদালতের উদ্দেশে বলেন, ‘পিটিশনার (মতিউর রহমান) একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। পত্রিকাটিও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে। ভাত জোটছে না বললেই কি স্বাধীনতার সম্মান নষ্ট হয়ে যায়। স্বাধীনতা কি এতই হালকা!’
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সাত বছরের এক শিশুকে ১০ টাকা দিয়ে তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি (মতিউর রহমান)। তারপর সংশোধনী দিয়েছেন। এভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নামে তাদের এ ধরনের দায়িত্বহীন আচরণ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। প্রথম আলোর মতো পত্রিকার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত নয়।’
আদালত তখন বলে, ‘যেহেতু একটা সংশোধনী হয়েছে, আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার তো তাদের রয়েছে।’
এ সময় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাছান চৌধুরী জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, ‘প্রথম আলোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেটি সঠিক কি না তা কিন্তু বের করেছে আরেকজন সাংবাদিক।’
আদালত বলে, ‘এ বিষয়ে তো প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করা যেত।’ শুনানি শেষে আদালত মতিউর রহমানকে জামিনের আদেশ দেয়।
অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য শুনে আদালত ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে মতিউর রহমানকে নিম্ন আদালতে যেতে হবে।’ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের লিখিত আদেশ পাওয়ার পর থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি জামিনে থাকবেন এবং এ সময়ের মধ্যে তাকে মহানগর দায়রা জজ আদলতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।’
