সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে সংসদ সদস্যরা বলেছেন, সংসদের মান ক্রমাগতভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। সংসদের চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে। সংসদকে সত্যিকার অর্থে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে হলে এখানে জনগণের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ইতিমধ্যে সংবিধানে যে জঞ্জাল জমেছে তা দূর করতে হবে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের চার মূল নীতিমালা ফিরিয়ে আনলেও জঞ্জালগুলো দূর না করলে আধুনিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না।
জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ ধারায় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার আনা প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে গতকাল শনিবার সংসদ সদস্যরা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা রয়েছে তা লঙ্ঘন করে সেখানে সাংঘর্ষিক বিষয় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে সংবিধানে যে জঞ্জাল জমে গেছে তা দূর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সত্যিকার অর্থে এই সংসদ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ফসল। তবে এই পার্লামেন্ট কখনো মসৃণ ছিল না। এই সংসদে কখনো আঘাত এসেছে, বাতিল হয়েছে, সংসদকে ঠুঁটো জগন্নাথ করা হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক খুনি ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে সরকারকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অবৈধ ক্ষমতাধারী জিয়াউর রহমান সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী করে সংবিধান পাল্টে দেন, অধিকার ক্ষুণœ করেন।
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘ইতিমধ্যে সংবিধানে যে জঞ্জাল জমেছে তা এখনো দূর করা যায়নি। ১২ বিধিতে সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা রয়েছে তা ভঙ্গ করে কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এখনো বহাল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের স্বীকৃতি দিয়েছেন কিন্তু তাদের মধ্যে অসন্তোষ দূর হয়নি। তাদের আদিবাসী হিসেবে নয়, নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের চার মূল নীতিমালা ফিরিয়ে আনলেও এই জঞ্জালগুলো দূর না করলে আধুনিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না।’
তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখছি আমাদের পার্লামেন্টের মান ক্ষুণœ হচ্ছে। এখানে এক ঘণ্টার বক্তব্যের মধ্যে ৩ মিনিট মাত্র গ্রামের সাধারণ মানুষের কথা হয়। বাকি কথা হয় দলের নেতার কথা, নিজের কথা। এর বাইরে সংসদ এগোতে পারছে না। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, সংসদে এমন অবস্থা হয়েছে এখানে আইনজীবী না থাকার কারণে ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন করতে আইনপ্রণেতাদের বাইরে থেকে আনতে হবে। আজকে রাজনীতি ও নির্বাচনের বাণিজ্যিকায়নের ফলে সংসদের চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে, নতুন চেহারা দাঁড়িয়েছে। আজকে ব্যবসায়ীর সংখ্যা সংসদে অনেক বেশি। ফলে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বাড়লে তাদের স্বার্থে সংসদের পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আজকে প্রয়োজন সংসদের সংস্কার করা। সংবিধান পর্যালোচনা প্রয়োজন।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু সংবিধানের চার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বিলোপ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাতিগত বিভ্রান্তি দূরীকরণ এবং ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতায়নে সংবিধান পর্যালোচনায় সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে তিনি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে এই সংবিধান পর্যালোচনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।
ইনু বলেন, নষ্ট রাজনীতির ধারক-বাহক বিএনপি ও জামায়াত তথাকথিত ২৭ দফা ও ১০ দফা দিয়ে সংবিধান খোলনলচে বদলে দেওয়ার হুংকার ছেড়েছে। সংবিধানটাকেই বাতিল করার কথা বলছে। তিনি বলেন, বিএনপি পঁচাত্তরের পর যেসব অপরাধ করেছে, এখনো তার পক্ষে সাফাই গাইছে। বিএনপি আসলে মুখে বাংলাদেশ, অন্তরে পাকিস্তান বলে জপ করছে। বিএনপি আসলে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে পাকিস্তানের বদলি খেলোয়াড়। বিএনপি সংবিধান খেয়ে ফেলতে চায়। রাজাকারদের রাজনীতির মধ্যে আবার ফিরিয়ে আনতে চায়। তারা সাংবিধানিক ধারা বানচাল করতে চায়। অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কোনো মাঝামাঝি রাস্তা নয়; বিএনপিকে রুখেই দিতে হবে, রাজনীতির মাঠ থেকে বিতাড়িত করতে হবে।
জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের মতের দ্বিমত থাকতে হবে। তবে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, সংসদকে সত্যিকার কার্যকর করতে চাইলে এই সংসদের মধ্যে মানুষের দুঃখ-কষ্ট সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতে হবে। সেই আলোচনা না হলে সবাই এখানে বললেও কেন্দ্রবিন্দু হবে না। সংসদের বাইরের কথাই কেন্দ্রবিন্দু হবে; যা বাইরে আছে তাদের কথাই গণমাধ্যমে প্রাধান্য পাবে। এটা কেবল বিরোধী দলের দায়িত্ব নয়। এটা আজকে সরকার দলের দায়িত্ব। সবাই মিলে আমাদের জনগণের কথা বলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দলের প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে। কিন্তু দলের চেয়ে রাষ্ট্র ও জনগণ বড়। সরকার দলের সদস্যদের বলবÑ এ দেশে কি কোনো ভুল হয় না? কই আপনারা তো সেই ভুল ধরে দেন না।’
বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে বিএনপি যেটা বোঝায়, আদতে সেটা নয় বলে মন্তব্য করে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষিতের হার ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেওয়া উচিত।
বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আছে। তার অধীনে নির্বাচন হবে। রাষ্ট্র চলবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
বর্তমানে দেশে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হচ্ছে দাবি করে সরকারদলীয় আরেক সদস্য তানভীর শাকিল জয় বলেন, আজকে আমাদের মহান স্বাধীনতা, স্বাধীনতা যুদ্ধকে অপমান করা হয়। আজকে স্বাধীনতা দিবসকে অপমান করে বিকৃতভাবে চাইল্ড এক্সপ্লোটেশনের মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়।
তিনি বলেন, আমি সেসব সুশীল বাবু এবং তাদের পত্রিকার কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, যখন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিলÑ তখন স্বাধীনতার চেতনা কোথায় ছিল? যখন ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল তখন স্বাধীনতা কোথায় ছিল? যখন বাংলাদেশে সারের জন্য কৃষকদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, যখন বিদ্যুতের জন্য সাধারণ মানুষকে গুলি করা হয়েছিল তখন স্বাধীনতা কোথায় ছিল? তখন তো আপনাদের বোধোদয় হয় নাই, তখন তো আপনারা স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন নাই। এখন আপনারা স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি করে সরকারি দলের আরেক সংসদ সদস্য ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নানান ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, সেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য আমাদের নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণসহকারে নিতে হবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নৌকা মার্কা বিজয়ী করে সোনার বাংলা বাস্তবায়িত করব।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও গণপরিষদ সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে এটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওই নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার বোর্ডেই বলেছিলেন।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু একমাত্র প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছেন, তার আগে অনেক নেতা ছিলেন তারা কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। বাংলাদেশের মানুষের পুরোপুরি মুক্তি চাননি। তারা ক্ষমতায় যেতে চেয়েছেন আর বঙ্গবন্ধু একমাত্র নেতা যিনি জীবন দিয়ে স্বাধীনতা দিয়ে গেলেন। এত কাজ করার পরও যদি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পক্ষে ক্যানভাস করতে হয় তাহলে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যে আরও দুর্ভোগ আছে।
