নির্বাচনী দায়িত্বে গাফিলতি করে নির্বাচনের প্রশিক্ষক!

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৩, ০৬:০৯ এএম

গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচনে অনিয়মে জড়িতদের শাস্তি দিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠালেও শাস্তি তো হয়নি, বরং ওই তালিকার অভিযুক্ত দুয়েকজনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসার সাইফুল ইসলাম তাদের একজন। তিনি এখন নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) পরিচালক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। অথচ ইসির সুপারিশে সাইফুলকে চাকরি থেকে দুই মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করার চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। তার মতো যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে সেসব নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আবারও চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। প্রথমবার দেওয়া চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, সুপারিশের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের ব্যাপারে কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি তা এক মাসের মধ্যে জানাতে। জানা গেছে, তদন্ত কমিটি ১৩৩ জনের শাস্তির সুপারিশ করলেও ৪০ জনকে নামকাওয়াস্তে অনুশাসন করা হয়। এদের অধিকাংশই শিক্ষক। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হলেও শাস্তি হয়নি।

সূত্রগুলো বলছে, গত ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর রিটার্নিং অফিসার, এডিসি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, নির্বাচন কর্মকর্তাসহ ১৩৩ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা চিঠি দিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করে সাংবিধানিক এ সংস্থাটি। প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করা হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষকের ইনক্রিমেন্ট এক বছরের জন্য বন্ধের কথা বলা হলেও নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ইসি কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের পাঁচ উপপরিদর্শক, একজন সহকারী উপপরিদর্শকসহ অন্যান্য কর্মকর্তার শাস্তির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। এ ব্যাপারে অগ্রগতি জানতে পুনরায় চিঠি দিল ইসি।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত ও তদন্ত কমিটির প্রধান সচিব অশোক কুমার দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২২ ডিসেম্বর ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে প্রথমবার চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তাদের কর্মকা- সন্তোষজনক না হওয়ায় নতুন করে চিঠি পাঠানো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। গত সপ্তাহে আলাদাভাবে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।

ওই উপনির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের মধ্যে সিসি ক্যামেরায় অনিয়মের দৃশ্য দেখে নির্বাচন বন্ধের নির্দেশ দেয় ইসি। অনিয়মে সম্পৃক্তদের চিহ্নিত করতে অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ইসির তদন্ত কমিটি ৬৮৫ জনের শুনানি করে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পায়। সেই তদন্তের আলোকে ১৩৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্তে বলা হয়েছে, ১২৫টি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন, সেসব কর্মকর্তার নামের তালিকা সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ এর ধারা ৫ অনুযায়ী তাদের স্ব-স্ব নিয়ন্ত্রণকারী/নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় কেন্দ্র নম্বর ২ (তরুণ কুমার, এসআই, গোবিন্দগঞ্জ থানা), কেন্দ্র নম্বর ৫৪ (মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, এসআই গোবিন্দগঞ্জ থানা), কেন্দ্র নম্বর ৫৯ (মো. আনিছুর রহমান, এসআই গোবিন্দগঞ্জ থানা), কেন্দ্র নম্বর ৬২ (কনক রঞ্জন বর্মণ, এসআই সাদুল্যাপুর থানা) ও কেন্দ্র নম্বর ১০৫ (মো. দুলাল হোসেন, এএসআই, আটোয়ারী থানা, পঞ্চগড়)-এর পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা তথা অসদাচরণের কারণে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ এর ধারা ৫ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় কমিশন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে কমিশনকে এক মাসের মধ্যে জানানোর নির্দেশ থাকলেও ১০ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়নি বলে সূত্র জানায়।

এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুশান্ত কুমার সাহার বিরুদ্ধে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ এর ধারা ৫ অনুসারে অসদাচরণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে এক মাসের মধ্যে জানাতে চিঠি দেওয়া হলেও তার বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্তের যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল তার তালিকা দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। ওই তালিকায় দেখা যায়, যাদের বিরুদ্ধে শাস্তি সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে রয়েছেন গাইবান্ধা ফুলছড়ি উপজেলার প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. জহিরুল ইসলাম, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ফুলছড়ি শাখার সিনিয়র অফিসার মো. শহিদুল্লাহ, একই ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম, ফুলছড়ি উপজেলার সহকারী প্রোগ্রামার মো. কাজল মিয়া, উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম, উপজেলা সমবায় অফিসার মো. আবদুল করিম, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার রাজীব আহম্মেদ, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার নিপুণ দেবনাথ, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, উপজেলা কৃষি অফিসার মো. মিন্টু মিয়া, উপজেলার ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. রোকনুজ্জামান, উপজেলার খাদ্য পরিদর্শক আবু মুসা মো. মনিরুজ্জামান ম-ল, ফুলছড়ি অগ্রণী ব্যাংক ফুলছড়ি শাখার সিনিয়র অফিসার মো. ফারুকুল ইসলাম, সাঘাটা অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. রাশিকুর রহমান প্রমুখ।

এক প্রশ্নের জবাবে অশোক কুমার দেবনাথ জানান, গাইবান্ধা উপনির্বাচনে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৩৩ জনকে চিঠি দেওয়া হলেও ৪০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই ৪০ জনের বেশিরভাগ শিক্ষক। নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের পাঁচজন উপপরিদর্শকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে আবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত