বৈশ্বিক কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া মার্চ মাসেও মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের অধিকাংশ মানুষকে খাবারের পেছনেই বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে অনেকেই ধার করছেন। এখন দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষ ধার করে জীবন চালাচ্ছে। যদিও গ্রামে এ হার আরও বেশি। সম্প্রতি পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত খানা আয়-ব্যয় জরিপে উঠে এসেছে এ তথ্য।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৩৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মানুষ আগের ১২ মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা বন্ধুবান্ধব থেকে ঋণ নিচ্ছে। এর আগে এমন জরিপ সর্বশেষ হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই বছর ধার করে চলেছে এমন পরিবারের সংখ্যা ছিল ২৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর ২০১০ সালের জরিপে এমন সংখ্যা ছিল ৩২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
বিবিএসের জরিপ বলছে, বর্তমানে এ পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি আকার ধারণ করেছে গ্রামগুলোতে। গ্রামের ৩৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ মানুষ ধারদেনা করে চলছে। এ সময় শহরের ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ মানুষকে ধার করে চলতে হচ্ছে।
দেশের পরিবারগুলোর বছরে কী পরিমাণ ঋণ নিতে হয় তারও জরিপ করেছে বিবিএস। জরিপে দেখা গেছে, ছয় বছরের ব্যবধানে পরিবারগুলোর ঋণ গ্রহণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশের প্রতিটি পরিবারের কমপক্ষে ৭০ হাজার ৫০৬ টাকার ওপরে ঋণ রয়েছে। ২০১৬ সালে পরবারপ্রতি ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৭৪৩ টাকা। ২০১০ সালে এমন ঋণের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৬২ টাকা।
অবশ্য ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি সঞ্চয়ের পরিমাণও বেড়েছে। পরিবারগুলোর জরিপে দেখা গেছে, আগের ১২ মাসের মধ্যে তারা ক্ষুদ্রঋণ বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখেছে ২১ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ১৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। তবে এসব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বাইরেও পরিবারগুলোর অর্থ জমা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। দেশের ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ মানুষ আগের ১২ মাসে তার পরিচিত অপ্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখেছে। দেশের ব্যাংকগুলোর ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতির কারণে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সঞ্চয় জমা রাখছে সাধারণ মানুষ।
এ ছাড়া নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সংখ্যাও বেড়েছে। ১৪ দশমিক ১২ শতাংশ পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য আগের এক বছরে ব্যাংকে হিসাব খুলেছেন। ২০১৬ সালে এ প্রবণতা ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
সামগ্রিকভাবে পরিবারগুলোর ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি থাকলেও গ্রামে উল্টোচিত্র দেখা গেছে। গ্রামের একটি পরিবার প্রতি মাসে গড়ে ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা আয় করে। অথচ ব্যয় হয় গড়ে ২৬ হাজার ৮৪২ টাকা; অর্থাৎ প্রতি পরিবার মাসে যা আয় করে তার চেয়ে ব্যয় বেশি হয় ৬৬৯ টাকা। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, শহর-গ্রাম মিলিয়ে পরিবারপ্রতি মাসে গড় আয় ৩২ হাজার ৪২২ টাকা, ব্যয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। এর অর্থ জাতীয় আয়ের চেয়ে গ্রামের পরিবারগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। তবে জাতীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রায় সমান চাপ সামলাতে হচ্ছে।
বিবিএসের বিগত খানা আয়-ব্যয় জরিপ বিশ্লেষণেও গ্রামীণ পরিবারে আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ২০১৬ সালের জরিপে গ্রামীণ পরিবারে মাসিক আয় ছিল ১৩ হাজার ৮৬৮ টাকা। ওই সময়ে ব্যয় ছিল ১৪ হাজার ১৫৬ টাকা। এবারের জরিপে পরিবারের গড় সদস্যসংখ্যা পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ২৬ জন।
কম আয় অথচ বেশি ব্যয় তাহলে বাড়তি ব্যয় কীভাবে মেটাচ্ছে গ্রামীণ পরিবারগুলো? জানতে চাইলে বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা বলেন, আয়- ব্যয়ের ব্যবধান মেটাতে পরিবারগুলো হয়তো ধারদেনা করে চলছে। অথবা আয়ের সঠিক তথ্য জরিপকালে তারা দেয়নি। আয়ের তথ্য জানাতে ঐতিহাসিকভাবেই মানুষের মধ্যে একটা ভীতি বা সংকোচের প্রবণতা আছে। ব্যয়ের তথ্য তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে দিয়েছে। তবে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কীভাবে মেটাচ্ছে মানুষ, সে তথ্য তুলে আনার চেষ্টা করা হয়নি জরিপে।
বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রামে পরিবারগুলোতে খাদ্যের পেছনেই বড় ব্যয় হয়। এ বাবদ মাসে ব্যয় হয় ১৩ হাজার ১২৫ টাকা। ২০১৬ সালের জরিপে খাদ্য খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ১ টাকা, অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে খাদ্যের পেছনে ব্যয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১০ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুসারে, গ্রামীণ পরিবারে খাদ্যের পেছনে গড় ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৫৪৩ টাকা।
খাদ্যবহির্ভূত খাতে পরিবারগুলোর ব্যয়ও গত সাত বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। গ্রামীণ পরিবারে এ খাতে মাসিক ব্যয় ১৩ হাজার ৮২ টাকা। ২০১৬ সালের জরিপে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৬৬ টাকা। ২০১০ সালের জরিপে এটি ছিল ৩ হাজার ৮৯৩ টাকা। খাদ্যবহির্ভূত খাত হিসেবে কেরোসিন, ডিজেল, পেট্রোলসহ সব ধরনের জ¦ালানি তেল, স্বর্ণ, পরিবহন ও যোগাযোগ, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়কে বুঝিয়ে থাকে বিবিএস।
পরিবারের বাইরে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে দেখা যায়, গ্রামে মাথাপিছু আয় ৬ হাজার ৯১ টাকা। জাতীয় মাথাপিছু আয় ৭ হাজার ৬১৪ টাকা। ২০১৬ সালের জরিপে গ্রামীণ এবং জাতীয় আয় ছিল যথাক্রমে ৩ হাজার ২৬১ এবং ৩ হাজার ৯৪০ টাকা।
