তিতাস গ্যাসের জরাজীর্ণ পাইপলাইন নিয়ে আতঙ্ক বেশ পুরনো। তবে সোমবার রাতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় গ্যাস এখন বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ অভয় দিয়েছে। কিন্তু তাতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন অনেকেই।
তিতাসের পাইপলাইনের কারণে বিভিন্ন সময়ে নানা দুর্ঘটনার পাশাপাশি সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তীব্রমাত্রায় গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার এসব ঘটনাকে বিপজ্জনক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য তিতাসের দায়িত্বহীনতা আর খামখেয়ালিকে দায়ী করছেন তারা।
প্রাকৃতিক গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ব্যাখ্যা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সোমবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঢাকার রামপুরা, বাড্ডা, বনশ্রী, বেইলি রোডসহ কয়েকটি এলাকায় গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তিতাস গ্যাসের ১৪টি ইমার্জেন্সি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে যেসব District Regulating Station (DRS)-এর মাধ্যমে ঢাকায় গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে, সেসব DRSথেকে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়। সে কারণে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
জ্বালানি বিভাগ আরও জানায়, পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকাসহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গ্যাসের ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় গ্যাস সরবরাহ লাইনে চাপ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ লাইনে চাপ স্বাভাবিক রয়েছে এবং গ্যাসের সরবরাহ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে নির্বিঘ্নে গ্যাস ও গ্যাসের চুলা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাইপলাইনের প্রত্যেকটা সিলিং নির্দিষ্ট চাপ সহ্য করতে পারে। পুরনো হওয়ার কারণে সিলিং ক্যাপাসিটি (সক্ষমতা) কমে যায়। সোমবার আগের চেয়ে গ্যাসের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে গ্যাস লিকেজ হয়। অথচ এটাই স্বাভাবিক চাপ। এ চাপ সহ্য করতে না পারার ফলে পুরো সিস্টেমের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।’
তিনি বলেন, তিতাস যখন বুঝতে পারল সরবরাহকৃত গ্যাসের চাপের চেয়ে তাদের পাইপলাইনের জয়েন্ট ও সিলিং ক্যাপাসিটি দুর্বল তখন আগেভাগেই এ চাপ কমিয়ে দিলে এমন সমস্যা হতো না।
একাধিক সূত্রমতে, সোমবার রাতে প্রায় পুরো ঢাকা শহরেই গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারত মানুষ চরম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিতাসকে দফায় দফায় ফোন দিয়েও তাদের সাড়া মেলেনি এমন অভিযোগ অনেকের। তাদেরই একজন মগবাজার এলাকার বাসিন্দা বকুল আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তিতাসের জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ফোন দিয়েও কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন দেওয়া হলেও তারা ধরেননি। অথচ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া গেছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও তিতাস চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে।’ তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত, গ্যাসের চাহিদা কম থাকলে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারত। দ্বিতীয়ত তিতাসের বিভিন্ন এলাকায় প্রেশার রিলিজ ভালভ আছে, যা দিয়ে সহজেই গ্যাসের চাপ কমানো যায়। কিন্তু তা না করে ঘটনার পর যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা হাস্যকর, অযৌক্তিক ও দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো মানেই হয় না। এখানে তিতাস চরম অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে।’
দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ঢাকা ও তার চারপাশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা পাইপলাইনের ৬০ শতাংশের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ বছরের পুরনো পাইপলাইনও রয়েছে। পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ এসব পাইপলাইনে ছিদ্র হয়ে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি তিতাসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে গড়ে তোলা অবৈধ পাইপলাইনে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০১০ সাল থেকে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে নানারকম বিধিনিষিধের কারণে অবৈধ সংযোগের সংখ্যা বেড়েছে।
আইন অনুযায়ী, পোস্টপেইড ও প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের বাসায় দুই বছরে একবার অথবা বছরে একবার পরিদর্শনে যাওয়ার কথা তিতাসের কর্মীদের। কিন্তু এ নিয়ম মানে না তিতাস। গ্রাহকদের বাসায় গিয়ে নিয়মিত যাচাই করার মতো পরিদর্শনকারী দল নেই প্রতিষ্ঠানটির।
বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিস্ফোরক কিংবা রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের পাশাপাশি বাতাসে গ্যাসের উপস্থিতিতে অগ্নিকা- কিংবা বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ হতে পারে। সাধারণত বাতাসে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপস্থিতি ৫ থেকে ৭ শতাংশ এবং এলপিজির উপস্থিতি ২ শতাংশের ওপরে গেলেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।’
গ্রাহকের টাকায় প্রতি বছর বিপুল মুনাফা করলেও তিতাসের সেবার মান উন্নত হয়নি। গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। কোনো দুর্ঘটনার পর জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন পরিবর্তন করা হয়নি।
গত অর্থবছরে তিতাসের জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অভিযোগ আসে ৬ হাজার ৮৬২টি, এর মধ্যে গ্যাসের পাইপলাইনে ছিদ্রের ঘটনা ৪ হাজার ৮৯১টি। আর অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটনা ৩১১টি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্যাস পাইপলাইন মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে তিতাসের বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে। তাদের অধিকাংশ লাইন অনেক পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। পাইপলাইনগুলো কোথায় কী অবস্থায় আছে সে সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা তাদের নেই। জরিপের মাধ্যমে সংস্থাটির পুরো পাইপলাইন নেটওয়ার্ক মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ব্যবহৃত লাইনে গ্যাস ডিটেক্টর (পাইপলাইনে ছিদ্র শনাক্তকরণ যন্ত্র) বসাতে হবে, যাতে কোথায় লিকেজ হলে সহজেই জানা যায়। তিতাসকে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার করে মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপলাইন সরিয়ে নতুন লাইন স্থাপন করতে হবে।
