সরকার না চাইলে সনদের স্বীকৃতি হতো না

আপডেট : ১৯ মে ২০২৩, ১১:০৪ পিএম

দেশের বৃহৎ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক। কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সহসভাপতি। সম্প্রতি তিনি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসের সংস্কার ও সনদের স্বীকৃতিসহ সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহসান সিরাজ

দেশ রূপান্তর : হাটহাজারীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কত দিনের?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : জন্ম থেকে হাটহাজারীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। হাটহাজারী মাদ্রাসার তৎকালীন মুহতামিম ও আমার পীর মাওলানা আব্দুল ওহাব (রহ.) এবং মাওলানা হাফিজুর রহমান (প্রকাশ পীর সাহেব হুজুর) আমার আকিকায় গিয়ে নাম রেখেছিলেন মুহাম্মদ ইয়াহইয়া। তাদের সঙ্গে আমার বাবার সুসম্পর্ক ছিল। তা ছাড়া আমার পড়াশোনাও হাটহাজারীতে। পরবর্তী সময় ১৯৯০ সালে আল্লামা আহমদ শফী (রহ.)-এর অনুরোধে আমি শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হই। বলতে গেলে আমার জীবনই হাটহাজারীর সঙ্গে জড়িত।

দেশ রূপান্তর : দেশের অন্যতম প্রাচীন ও আলোচিত মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, কোনো চাপ কিংবা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : এমনটা মনে হয়নি। কারণ, আমি মাওলানা আব্দুল ওহাব (রহ.), মাওলানা হামেদ (রহ.) ও আল্লামা আহমদ শফী (রহ.)কে মাদ্রাসার পরিচালনায় দেখেছি। তাদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তা ছাড়া আমার বাবার কাছ থেকে শিখেছি প্রতিষ্ঠান কীভাবে চালাতে হয়। তিনি খুব সহজে মানুষের মধ্যে কাজ বণ্টন করে দিয়ে দিতেন, আমিও তাই করি।

দেশ রূপান্তর : অর্থনৈতিক বিষয়ে কখনো কোনো চাপ অনুভব হয়েছে?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : আলহামদুলিল্লাহ, ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো অর্থনৈতিক অভাবের মধ্যে পড়িনি। পারিবারিকভাবে আমরা স্বাবলম্বী ছিলাম। কিন্তু মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর হয়তো জানানো হয়েছে, বোর্ডিংয়ের চাল নেই! খাবার তিনদিনের আছে তখন কিছুটা চিন্তিত হয়েছি। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করি, এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করি, হয়ে যায় ব্যবস্থা।

দেশ রূপান্তর : হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে এ যাবত কী পরিমাণ মাওলানা, মুফতি বের হয়েছে, কোনো পরিসংখ্যান আছে কি?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : হাটহাজারী থেকে অনেক মুফতি, মুহাদ্দিস এবং মাওলানা বের হয়েছেন। শুরুর দিকে হয়তো কিছু বাদ গেছে। পরে যখন নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফতোয়া বিভাগ চালু হয়, তখন থেকে সবার তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। মাওলানাদেরগুলো আগে থেকেই সংরক্ষণে আছে।

দেশ রূপান্তর : তাদের নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : সরকার হাইয়াতুল উলইয়ার স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু দারুল উলুম দেওবন্দ এমন স্বীকৃতি নেয়নি, তারা স্বাধীন। হাটহাজারী মাদ্রাসা কখনোই সরকারের অধীনে ছিল না, এখনো থাকতে চায় না। দফতুরে দারুল উলুম দেওবন্দ (দেওবন্দের নীতিমালা) যেভাবে হয়েছে, তেমনিভাবে বাংলায় আমি একটি দফতুরে হাটহাজারী তৈরি করেছি। মজলিসে শূরা এটার অনুমোদন দিলে হাটহাজারীর ফুজালাদের (প্রাক্তন ছাত্রদের) ডেকে এই নীতিমালা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই আলোকে মাদ্রাসা পরিচালনা হবে। এটা আমার চিন্তা। বাস্তবায়ন হতে পারে আবার নাও হতে পারে। আমার কাজ তো শুধু চেষ্টা করা!

দেশ রূপান্তর : শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) একসময় কওমি সনদের স্বীকৃতি চাননি, পরে তার হাত দিয়েই স্বীকৃতি এসেছে বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : না, না, বড়দের বিষয়ে কোনো কথা বলব না। সরকার চেয়েছে এ জন্য স্বীকৃতি হয়েছে। সরকার না চাইলে এটা হতো না। কারণ, সরকারের শরিকদের অনেকেই এর বিরোধিতা করেছে, তারপরও দারুল উলুম দেওবন্দের উসুলে হাসতেগানা (আট মূলনীতি) অনুযায়ী স্বীকৃতি হয়েছে। ভবিষ্যতে এতে কোনো পরিবর্তন হবে না এটা বলা যায় না। সরকার চাইলে সবই করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : হাটহাজারী মাদ্রাসা একটি আবেগের নাম। বর্তমানে ছাত্ররা কি সেটা ধারণ ও ধরে রাখতে পারছে?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : শুধু হাটহাজারী নয়! প্রায় জায়গাতেই কিছুটা কমেছে, আগের মতো আবেগ বা আমল ছাত্রদের মধ্যে কাজ করে না। তবে উস্তাদগণ যথেষ্ট মেহনত করে যাচ্ছেন! এ জন্য খানকা তৈরি করা হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : মাদ্রাসা পরিচালনা ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আপনার একটি ফাউন্ডেশন আছে। আবার দেশজুড়ে মাহফিলসহ দ্বীনি কাজে প্রচুর সফর করনে, এ বয়সে এত কাজের প্রেরণা কোথায় পান?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : বুজুর্গদের দোয়া এবং ছায়া আমার ওপর আছে। তা ছাড়া আমি শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) এবং আমার বাবাকে দেখেছি, তারা কোনো অবস্থাতেই হাল ছেড়ে দিতেন না। অনেক বড় বড় কাজ তারা চাপমুক্ত হয়ে করেছেন। তাদের থেকে প্রেরণা পাই, আমিও তাই করি। ফাউন্ডেশনের জন্য লোক রাখা আছে। তারা কাজ করে।

দেশ রূপান্তর : অন্য মুহতামিমদের জন্য আপনার কোনো বার্তা আছে কি?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : মাদ্রাসার সুনাম মুহতামিমের আচরণের ওপর নির্ভর করে। মাদ্রাসার মুহতামিম যদি অর্থনৈতিক হিসাব, শিক্ষকদের বেতন এবং ছাত্রদের পড়ালেখার মান নিয়ে ভাবে, বিশেষ করে ফান্ড নিজের পকেটে না রাখে তাহলে অবশ্যই মাদ্রাসা সুনাম হবে, না হয় মাদ্রাসার স্বতন্ত্র কোনো বৈশিষ্ট্য দাঁড়াবে না। মনে রাখবেন, মুহতামিম যত বেশি আমানতদার হবে, মাদ্রাসার আয় উন্নতিতে আল্লাহতায়ালা তত বেশি বরকত দেবেন।

দেশ রূপান্তর : অনেকেই কওমি সিলেবাসে সংস্কারের দাবি করছেন, আপনার কী মত?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : এই দাবির পক্ষে আমিও। তবে সেটা প্রাচীন পদ্ধতিতে! হাটহাজারীতে কিংবা কওমি মাদ্রাসায় আগে যেসব কিতাব পড়ানো হতো, সেই কিতাবগুলো আবার পাঠ্যপুস্তকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলে বর্তমান সময়ের বিজ্ঞানসহ আধুনিক যত বিষয় আছে এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আমাদের কী নেই? আমাদের সবই আছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি!

দেশ রূপান্তর : কওমি সনদের স্বীকৃতিকে কর্মক্ষেত্র ও উচ্চশিক্ষার কাজে ব্যবহারের দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে, আপনার মত কী?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : সনদের স্বীকৃতি দিয়ে কর্মক্ষেত্র বলতে আমি সরকারের চাকরি বুঝি। কেউ যদি সরকারের সার্টিফিকেট নেয় এবং তার অধীনে চাকরি করে, তাহলে কোনোদিন সে সরকারের অনৈতিকতা কিংবা ধর্মবিরোধী কোনো কাজের বিরুদ্ধে বলার নৈতিক সাহস করবে না। হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে তখনকার সরকারের কাজির পদ নেওয়ার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি নেননি, কারণ কী ছিল? কারণ একটাই ছিল। সেটা হলো সরকারের কোনো শরিয়তবিরোধী কাজের সমালোচনা করা যাবে না, এমনকি সাধারণ মাকরুহ কাজেরও স্বীকৃতি দিতে হবে। আলেম হিসেবে যা কখনোই সম্ভব নয়।

আর উচ্চ শিক্ষা! কওমির সনদ নিয়ে ছাত্ররা দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে? সেখানে কোন বিভাগে পড়বে তারা? কারা পড়াবেন তাদের? যারা পড়াবেন তারা কি আলেমদের চেয়ে বেশি শিক্ষিত? হাটহাজারীর সনদ দিয়ে ছাত্ররা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। এ জন্য হাইয়াতুল উলইয়ার সনদের প্রয়োজন পড়েনি!

দেশ রূপান্তর : গণমাধ্যমে ইসলাম উপস্থাপনে কীভাবে কাজ করা যেতে পারে?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : আমি এ লাইনের মানুষ না। যারা গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করেন তারা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।

দেশ রূপান্তর : হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে আপনি সারাদেশের আলেম-উলামাদের মুরব্বি। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার কোনো বিশেষ বার্তা রয়েছে কি?

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া : প্রথমে আলেমদের বলব, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া। মানুষ আলেমদের কাছে কম আসে। এ জন্য আলেমদের উচিত তাদের কাছে বেশি বেশি যাওয়া, তাদের দ্বীন শেখানো, সাহায্য-সহযোগিতা বেশি বেশি করা। ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখি, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে সাহাবিদের এক ইহুদির কূপ থেকে পানি আনতে হতো বিনিময় দিয়ে। তাও আবার তার ইচ্ছা অনুযায়ী বিতরণ করত। মুসলমানদের জন্য সেটা ছিল কষ্টদায়ক, কারণ সেই ইহুদি মনে চাইলে কাউকে দিতেন না হয় দিতেন না। হজরত উসমান (রা.) মানুষের কল্যাণে সেই কূপ ক্রয় করে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

আর সাধারণ মানুষের উচিত, সত্য বুঝে আল্লাহওয়ালা আলেমদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলা। তাহলে খুব সহজেই তিনি দিনের পথে চলতে পারবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত