নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) পুরো আসনের নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা না দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’ (আরপিও) সংশোধনের খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাইবান্ধার মতো পরিস্থিতি এড়াতে এ কৌশল নিয়েছে সরকার। আর বলেন, ইসির দাঁত-নখ কেটে ফেলার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলো।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইসির প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ না করায় কমিশনে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
তবে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরো আসনে ফল বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে না দেওয়ায় খুব একটা সমস্যা হবে না। আমরা গাইবান্ধার ভোট যেভাবে বাতিল করেছিলাম, সেটা আমরা আরও স্পষ্ট করে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা হয়নি।’
জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১(এ) ধারায় বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশন যদি সন্তুষ্ট হয় যে, নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন এবং চাপ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিরাজমান অপকর্মের কারণে যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সংগত এবং আইনানুগভাবে নির্বাচন পরিচালনা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না, তাহলে যেকোনো ভোটকেন্দ্র বা ক্ষেত্রমতো সম্পূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে ভোটগ্রহণসহ নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে।’
সূত্রগুলো জানায়, বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এ বিধানের সঙ্গে আরেকটি উপধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসি। কিন্তু তা আমলে না নিয়ে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে পুরো নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে না দেওয়ার কথা বলা হয়। বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নির্বাচনের যেকোনো মুহূর্তে পেশিশক্তি বা অন্য যেকোনো কারণে এক বা একাধিক কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। এক বা একাধিক কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ফল বাতিল করতে পারবে। পুরো নির্বাচন বাতিল করার কোনো প্রভিশন আইনে নেই বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
আরপিও সংশোধনের প্রস্তাবটি অনুমোদনের পর এখন এটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে তোলা হবে। জাতীয় সংসদে বিল পাস হলে আইনে পরিণত হবে।
গত ১২ অক্টোবর গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে উপনির্বাচনে ভোট ছিল। অনিয়মের কারণে একপর্যায়ে পুরো আসনের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেয় ইসি। যে প্রক্রিয়ায় ঢাকায় বসে নির্বাচন কমিশন গাইবান্ধার ভোট বন্ধ করেছে তাতে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা হতবাক হয়েছিলেন। ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কমবেশি প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও করেছিলেন তারা। তখনই আলোচনায় এসেছিল বিষয়টি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইসির সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, ‘প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা আমাদের বলেছেন, ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। ডিসি বলেছেন, ভোটে কোনো অনিয়ম হয়নি। অথচ নির্বাচন কমিশন ভোট বন্ধ করে দিল। এ কারণে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’
গত ২২ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা বলেছেন, ‘আমাদের একটাই মেসেজ, জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে কোনোরকম বাধা ছাড়াই ভোট দিতে পারবেন। আমরা সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আর অনিয়মের কারণে গাইবান্ধার উপনির্বাচনে যেমন ভোট বন্ধ করে দিয়েছি, জাতীয় নির্বাচনেও অনিয়ম হলে ভোট বন্ধ করে দেব।’
আসছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে যদি গাইবান্ধার মতো পরিস্থিতি হলে সরকার ইসির গাইবান্ধার পদক্ষেপে বিপদে পড়বে। কেননা, ইসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেটা করতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার পুরো আসনে ভোট বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে দিতে চায় না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম মামলার রায় প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ সালে। রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে ইসি তদন্ত সাপেক্ষে বাতিল করতে পারবে। ফলে এ পর্যায়ে এসে আইনিভাবে ইসির ক্ষমতা ছেঁটে ফেলা হলো বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় রয়েছে এ বিষয়ে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কীভাবে এটা করল তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। কেননা এ সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
তার মতে, ইসির ক্ষমতা প্রয়োগের অবারিত সুযোগ আছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর তারা কী করবে সেটা এখন দেখার বিষয়। ইসির ওপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাচ্ছে সেটা পরিষ্কার।
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে দুটি বিষয় সামনে এলো। প্রথমত ইসির দাঁত-নখ কেটে ফেলা হলো। দ্বিতীয়ত ইসি যাতে দানব হয়ে যেতে না পারে, মানে ইসি চাইলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেরই ভোটও বাতিল করতে পারে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হলো।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, এটা করার মধ্য দিয়ে সরকার আবারও প্রমাণ করল, তারা একতরফা নির্বাচন ফের করতে চায়। নির্বাচন কমিশন নিয়ে আমাদের শঙ্কাও সত্যি হলো যে, এ কমিশন সরকারের বাইরে নয়।
কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, এ সিদ্ধান্ত আমরা নেতিবাচক হিসেবে দেখছি। সরকার অতীতে, বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেটি প্রমাণিত হলো। তাই এ ইসির অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া আত্মহত্যার শামিল। কারণ এ কমিশন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।
