সাধারণত পুরুষের চেহারায় অত মায়া থাকে না। কিন্তু তার আছে। দেখলেই প্রশান্তি লাগে। অল্প শব্দের হাসি আর ব্যবহারে, দেহ-মন চনমনিয়ে ওঠে। ঈর্ষা হয় এই ভেবে, একজন মানুষের মধ্যে ভালোলাগার এত বিষয় কেন থাকবে? বিধাতা যেন অকৃপণভাবে গড়ে তুলেছেন। ১৯৫৭ সালে পুরান ঢাকার লালবাগের উর্দু রোডে জন্ম নেওয়া মানুষটি, মেধা ও মননে যেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
মোরশেদুল ইসলাম। পড়াশোনা শুরু চাঁদনীঘাট প্রাইমারি স্কুলে। এরপর নবকুমার ইনস্টিটিউশন। সেখান থেকে আবার ওয়েস্টার্ন হাই স্কুলে এসএসসি। এরপর ঢাকা কলেজ। তারপর? তিনি বললেন, এরপর তো পড়াশোনা নিয়ে অনেক দৌড়ঝাঁপ। আমি পড়তে চাই এক বিষয়ে, বাসা থেকে বলে না, হবে না।
যেমন? আর বলো না। বিতিকিচ্ছিরি বিষয়। আমি কিন্তু ছাত্র খারাপ ছিলাম না, হা হা হা। হলো কি, প্রথমে তো পড়াশোনার সুযোগ পেলাম ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে। বিষয় নিলাম সাংবাদিকতা। কিন্তু বাসায় সবাই বেঁকে বসলেন। বলা হলো না, তোমাকে ডাক্তার হতে হবে। কী আর করা? যেহেতু চান্স পেয়েছি, ভর্তি হলাম সিলেট মেডিকেল কলেজে। বাসার সবার ইচ্ছে, আমাকে ডাক্তার বানানোর। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ডাক্তারি পড়া শুরু করলাম। দেখলাম, এই বিষয় আমার জন্য না। বাসায় জানালাম। তারা একটু মনঃক্ষুণœ হলেন। আবার চলে এলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় পেলাম ফার্মেসি। তাই-ই পড়তে থাকলাম। একসময় পড়াশোনা শেষ হলো। কিন্তু ওই যে, মাথার মধ্যে নির্মাণের ভূত!
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে একটি গল্প লিখলেন তিনি। এরপর চিত্রনাট্য ও সংলাপ। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পেল মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে তৈরি বাংলাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রÑ আগামী। চারদিকে হইচই শুরু হয়ে যায়। বাণিজ্যিক ধারার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শুরু করলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন। এরপর থেকে একের পর এক ছবি নির্মাণ। এ পর্যন্ত আগামী, চাকা, দীপু নাম্বার টু, দুখাই, দূরত্ব, খেলাঘর, প্রিয়তমেষু, আমার বন্ধু রাশেদ এবং অনিল বাগচির একদিন নামের নয়টি ছবি পরিচালনা করেছেন। পেয়েছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার।
১৯৮৪ থেকে ২০২৩। দীর্ঘ ৩৯ বছরে এত প্রাপ্তি সত্ত্বেও, এতটুকু অহংকার নেই তার। ঠোঁটে যেন মধু লেগেই থাকে। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের উচ্চপদে কর্মরত থেকেও, স্বভাবে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনেননি। বললেন দেখো, অল্প বয়স থেকেই আমি চেয়েছি নিজে কিছু করব। ভাবলাম তাহলে তো চলচ্চিত্র নির্মাণই ভালো পথ। তখনই কিন্তু অসম্ভব আগ্রহ জন্মায় ফিল্মের প্রতি। বলা ভালো, ভালোবাসাটা সংস্কৃতির প্রতি। ছোটবেলায় কচিকাঁচা মেলার একটা শাখা করি, পুরান ঢাকায়। যেখানে আমরা থাকতাম, সেই এলাকায়। তখন আমি ক্লাস সেভেন অথবা এইটে পড়ি। এরপর যখন এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, তখন আমরা ‘ঢাকা লিটল থিয়েটার’ নামে একটা নাটকের দল করলাম। বছরটা ১৯৭৮। এটাই কিন্তু ঢাকার প্রথম ছোটদের নাটকের দল। তখন নিয়মিতভাবে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মঞ্চস্থ হতো। এই দলের সঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, তার স্ত্রী প্রয়াত নাজমা জেসমিন চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন বরেণ্য মানুষ যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই আমরা বেশ কয়েকটা প্রযোজনা করি। মনে আছে, প্রথম প্রযোজনা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তাসের দেশ’। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ মঞ্চস্থ হয়। সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নাটকটির নির্দেশনা দিই। ১৯৮১ সালে এটি মঞ্চস্থ হয় মহিলা সমিতি মিলনায়তনে। এভাবেই কিন্তু আস্তে আস্তে ফিল্মের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। তখনই ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হই। এরপর নিজেরাই একটি ফিল্ম সোসাইটি তৈরি করি ১৯৮২ সালে। তারপর ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করি। প্রথমবারের মতো ফিল্ম আর্কাইভ এটার আয়োজন করেছিল। কোর্স ডিরেক্টর ছিলেন আলমগীর কবির। তিন মাসের এ কোর্স করেই চলচ্চিত্রের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। একটু সাহসও হয়। এরপরই কিন্তু ‘আগামী’ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠি। তখন কিন্তু আমি বেশি বড় না। হা হা হা, মাত্র দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনা করছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে।
পড়াশোনা নিয়ে অস্থিরতার বিষয়ে হেসে বললেন, আসলে প্রবল ইচ্ছে ছিল জার্নালিজম অ্যান্ড মাস কমিউনিকেশন পড়ার। কারণ, এ বিষয়টাই আমার প্রত্যাশার কাছাকাছি। তখনো নাটকের ওপর কোনো কোর্স চালুু হয়নি, ফিল্মের ওপর তো নয়ই। তখন আমি মনে করেছিলাম ‘জার্নালিজম’ বিষয়ে যদি পড়াশোনা করি, তাহলে কাছাকাছি থাকা যাবে। এ চিন্তা করেই কিন্তু সাংবাদিকতায় ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু বাসার চাপে তো পারলাম না হা হা হা। পরে তো ডাক্তারি বাদ দিয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে পড়াশোনা করলাম। প্রাণখোলা হাসি দিয়ে বললেন, ছাত্র কিন্তু খারাপ ছিলাম না!
ততদিনে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন জীবনে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাই হবেন। পড়াশোনা যে বিষয়েই হোক। বললেন, ফিল্ম নির্মাণই যে মুখ্য বিষয় হবে এটা কিন্তু ভাবিনি। এখনো অবশ্য তা হয়নি। অনেকে বলেন, মোরশেদুল ইসলামের চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ এবং জাফর ইকবালের বিরাট প্রভাব আছে। এ কথা শুনে তিনি অনেকক্ষণ হাসলেন। স্পষ্ট উচ্চারণ তার আসলে তা না। আমি যখনই বাচ্চাদের ছবি করতে গেছি, দেখি জাফর ইকবালের চেয়ে ভালো বাচ্চাদের ওপর কেউ লিখতে পারে না। যে কারণে তার লেখা কাহিনি নিয়ে তিনটা ছবি করেছি। আবার হুমায়ূন আহমেদের গল্প নিয়েও তিনটি ছবি করেছি। এখানেও সেই একই বিষয়।
ক্রাউড ফান্ডিং নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয়ে তিনি বললেন, এটা করতে পারলে ভালো। বেশ কয়েকজনই তো এ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে যুবরাজ শামীম নামে একজনের কাজ আমার খুব ভালো লেগেছে। ওর ‘আদিম’ ছবিটি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। আরও কয়েকটি উৎসবে ছবিটি পুরস্কৃত হয়েছে। বস্তিবাসীর জীবন নিয়ে এ ছবিটি নির্মিত হয়েছে। এ কারণে পরিচালক কিন্তু এক বছর বস্তিতে থেকেছে। উপলব্ধি করেছে বস্তিবাসীর জীবন।
জীবনকে উপলব্ধির মধ্যে নিয়ে আসতে হলে চলচ্চিত্রকে ধারণ করতে হবে। এর কিন্তু কোনো বিকল্প নেই। যদিও অনেক কিছুই আর আগের মতোন নেই। তবু স্বপ্ন দেখতে হবে। জেগে থাকতে হবে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মোরশেদুল ইসলামের কথাÑ আমরা সবাই ভালো আছি, অনেক ভালো। জীবনে ভালো থাকতেই হবে, খারাপকে প্রশ্রয় দিতে নেই। মনে রেখোÑ জেগে থাকতে হবে, ভালোবাসতে হবে।
