পাচার অর্থ ফেরতে থাকবে না সুবিধা

আপডেট : ২২ মে ২০২৩, ০৫:৩৪ এএম

আগামী অর্থবছরের বাজেটে যারা বোতলজাত পানি পান করেন তাদের জন্য ভালো খবর নেই। এনবিআরের প্রস্তাবে বোতলজাত পানির ওপর রাজস্ব বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে আগামী অর্থবছরের বাজেটে। এছাড়া প্রসাধনী ও জুয়েলারি পণ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এদিকে আগামী অর্থবছরে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনতে বিশেষ সুবিধা আর থাকছে না। ১ জুলাই থেকে প্রচলিত নিয়মে বিদ্যমান মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত রাজস্ব ও জরিমানা দিয়ে পাচারকৃত অর্থ দেশে আনতে হবে। 

অন্যদিকে রাজস্ব আইনের মারপ্যাঁচে দামি গাড়ির মালিকদের খরচ বেশি বাড়বে। ঘন ঘন যারা বিদেশে যান তাদের ওপরও রাজস্বের থাবা বসানো হতে পারে আগামী অর্থবছরের বাজেটে। এখানেই শেষ নয়, বেশি সম্পদ থাকলে সারচার্জ নামে এক ধরনের মাশুল দিতে হয়। এই সারচার্জও বাড়ানো হতে পারে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এসব প্রস্তাব থাকতে পারে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।

তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ছক কষতে গিয়ে এনবিআর সম্পদশালীদের ওপর নজর বাড়িয়েছে। ধনী হওয়া অপরাধ নয়। তাই শুধু ধনী হওয়ার কারণে অতিরিক্ত রাজস্বের ভার চাপানো হলে দেশ থেকে অর্থ পাচার করে অন্য দেশে তা ব্যবহারে আগ্রহী হবে অনেকে। তবে রাজস্বের জালের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব সময়োপযোগী। 

এনবিআর সূত্র জানায়, রাজধানী থেকেই ৪০ লাখ নতুন করদাতা খুঁজে বের করার হিসাব কষেছে সরকার। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে থেকে আরও ৬০ লাখ করদাতা পাওয়া যাবে বলে আশা করেছে। আগামী ১ জুলাই পেশ করা বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘরের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে করদাতা সন্ধানের কথা জানাবেন। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে শুধু করদাতা খুঁজে বের করেই থামছেন না। এসব এজেন্টদের দিয়ে করদাতারা রিটার্ন জমা দিয়েছেন কি না তাও যাচাই করা হবে।

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, কর এজেন্ট নিয়োগ দেওয়ার ধারণাটি ভালো। তবে উদ্যোগটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুরুতে হয়তো কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে কাজ করার সময় তা সংশোধন করে নিতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে জানা যায়, আগামী বাজেটে আয়করের আওতা বাড়ানোয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য করদাতা সংগ্রহে জোর দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বাজেট বিষয়ক এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ধাপে ধাপে করদাতার সংখ্যা বাড়িয়ে পরোক্ষ করের নির্ভরতা কমিয়ে আয়কর আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর রাজস্ব পরিশোধের চাপ কমবে।

সম্পদশালীরা কর দিতে বাধ্য হবেন। এ ক্ষেত্রে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। দেশে চার কোটি থেকে পাঁচ কোটি মানুষ আয়কর দেওয়ার উপযুক্ত হলেও কর দিচ্ছেন না। তাদের যদি আমরা আস্তে আস্তে কর নেটের আওতায় নিয়ে আসতে পারি তাহলে আমাদের রাজস্ব আহরণ অনেক বাড়বে।

অন্যদিকে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থ বিলে বিদ্যমান ভ্রমণ কর ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। বিদ্যমান আইনে যারা সার্কভুক্ত দেশগুলোতে ভ্রমণ করেন তাদের প্রত্যেককে পরিবহনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ৫০০-১২০০ টাকা দিতে হয়। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন, জাপান, হংকং, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া এবং তাইওয়ানে ভ্রমণকারীদের জন্য কর ৪ হাজার টাকা। এছাড়া অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে ভ্রমণ কর গড়ে ৩ হাজার টাকা। এখানেই শেষ না, বছরে নিট আয় ৫ লাখ টাকার বেশি হলে অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর কর দিতে হয় ২৫ শতাংশ হারে। এই হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ কর বাড়ানো হতে পারে। এতে আগামী অর্থবছর থেকে ধনীদের করহার বাড়াবে। একই সঙ্গে সব সø্যাবেই সারচার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে এনবিআর। সারচার্জ হচ্ছে এক ধরনের মাশুল, যা ব্যক্তির সম্পদের দলিল মূল্যের ওপর আদায় করা হয়।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এর তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত মোট গাড়ির সংখ্যা ৫২ লাখ ৯২ হাজার ৪৪০টি। এর মধ্যে দামি গাড়ি ২৫ হাজারের বেশি। প্রাইভেট কার ৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৯১টি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে একাধিক গাড়ি থাকলে নিয়মিত করের বাইরে যে গাড়ির সিসি ক্ষমতা বেশি হবে সেটির ওপর কার্বন কর ধার্য করা হতে পারে। এ কর গাড়ির নিবন্ধন এবং নবায়নের সময় ২৫ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এটি আমাদের দেশে প্রথমবারের মতো ধার্য করা হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ সিসির অর্র্থাৎ দামি গাড়ির শুল্ক হার বাড়ানো হতে পারে। ২০০১ থেকে ৩০০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির সম্পূরক শুল্ক ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০ শতাংশ এবং ৩০০১ থেকে ৪০০০ সিসি পর্যন্ত ৩৫০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ শতাংশ করা হতে পারে। আগামী বাজেটে দ্বিতীয় গাড়ির অগ্রিম কর বাড়ানোরও প্রস্তাব আসতে পারে। বিদ্যমান আইনে অগ্রিম কর ২৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। আগামীবারে এ হিসাব ক্ষেত্রবিশেষে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে অর্থ বিলে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত