ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল

আপডেট : ২৭ মে ২০২৩, ০৬:১৩ এএম

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণার শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফলাফলে ইভিএমের কার্যকারিতার বিষয়টি আবার সামনে এলো। ফল ঘোষণায় বিলম্ব এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর অভিযোগ সব মিলিয়ে এ যন্ত্র ব্যবহারের সফলতা নিয়ে নতুন করে আবার প্রশ্ন উঠল।

গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ইভিএম কোথাও কোথাও নষ্ট হয়েছে, কোথাও আঙুলের ছাপ মেলেনি। অনেক ভোটার বুঝে উঠতে পারেনি, ঠিক কোথায় ভোট দিতে হবে। এতে করে ভোটের গতি ছিল ধীর। অনেক ভোটার ভোট না দিয়েই চলে গেছেন। ভোটগ্রহণ কম হয়েছে। এসব জটিলতায় নিয়েই পরবর্তী চারটি সিটি করপোরেশনে (সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী) ভোট করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে কার্যকর ফল পাবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজীপুরের ভোটে সারা দিন ভালো ছিল। শেষ মুহূর্তে ফল ঘোষণা করতে গিয়ে সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছে ইসি। ইভিএমের ভোট গণনা হওয়ার কথা দ্রুত। সেখানে প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর ফলাফল ঘোষণায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। ইভিএম বাদ দিয়ে পরবর্তী চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন ব্যালটে হলে ইসির জন্য জাতীয় নির্বাচনের ট্রায়াল হতো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর সিটি নির্বাচনে এ প্রতিবেদক অন্তত ১০টি কেন্দ্রের প্রায় ২৫টি বুথে সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে টঙ্গী দারুস সালাম মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে সকাল থেকেই ভোটারদের লম্বা লাইন ছিল। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কয়েকটা ইভিএম ঠিকমতো কাজ করছিল না। তাই ভোট দিতে দেরি হচ্ছিল। হানিফ সরকার নামে এক ভোটার অভিযোগ করেন, সাতবার আঙুলের ছাপে ভোট দিতে ব্যর্থ হয়ে পরে তিনি স্মার্টকার্ড দিয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জাকির হাসান তালুকদার বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কয়েকটি মেশিনে ভোট দিতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে ভোটারদের। পরে সেগুলো ঠিক করা হয়েছে।’

হরিনাল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার শফিকুর রহমান জানান, তিনি আগে কখনো ইভিএমে ভোট দেননি। তার ভোট দিতে প্রায় ১০ মিনিট সময় লেগেছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার হাসান ইমাম বলেন, বয়স্কদের ক্ষেত্রে অনেকের আঙুলের ছাপ মিলতে সময় লাগছে। ৭৩ নম্বর মাধবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে (৩ নম্বর বুথ) একটি ইভিএম মেশিন বিকল ছিল বেশ কিছুক্ষণ। এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আবদুল মোতালেব  বলেন, ৭ নম্বর কক্ষে ইভিএমের একটি ভোটগ্রহণ মেশিনে সমস্যা হয়েছে। গাজীপুর আউচপাড়া নিউ ব্রুন স্কুল কেন্দ্রে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী এমএম নিয়াজ উদ্দিন ভোট দেন। সেখানে ইভিএম কাজ না করার কারণে তিনি বেশ কিছুক্ষণ ভোট দিতে পারেননি। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, মেশিনে বোধহয় একটু সমস্যা ছিল। মেশিনটা স্টার্ট দেওয়ার মুহূর্তে বোধহয় কিছুটা জটিলতা ছিল। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ পরেই এটা ঠিক হয়েছে।

কেন্দ্র ঘুরে জানা গেছে, বয়স্ক ও নারী ভোটাররা ইভিএমে ভোট দিতে বেশি সমস্যায় পড়েন। কয়েকবার ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া বোঝানোর পরও অনেকে উল্টাপাল্টা বাটন চেপেছেন। এ কারণেও কোথাও কোথাও ইভিএম নষ্ট হয়েছে। একজনকে বোঝাতে কয়েক মিনিট লেগে যাওয়ায় ভোটগ্রহণ ধীর হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের সমর্থিত পরাজিত প্রার্থী আজমত উল্লা খানও নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ইভিএমে কিছু ত্রুটি ছিল। ইভিএমে অনেকে ভোট দিতে পারেনি।

জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাজীপুর নির্বাচনের পরিবেশ সন্তোষজনক হলেও ইভিএমের কারণে ভোটগ্রহণের গতি ধীর ছিল। ইভিএমের বিষয়ে আমরা আগেও বলেছিলাম, এ যন্ত্রে ভোট পুনঃগণনা করলে একই ফল আসবে। কিন্তু এখানে টালি করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি অভিযোগ করে তার ফলাফল ট্যাম্পারিং করা হয়েছে, তাহলে সেটা আপনি টালি করবেন কীভাবে? কারণ, আপনার কাছে কোনো পেপার ট্রায়াল নেই। ইভিএমে পুনঃগণনার যে বিশাল সংকট রয়েছে তা নির্বাচন কমিশনকে ভাবতে হবে। ব্যালট পেপার কেউ নিয়ে গেলেও সেটা ফাইন্ড করা সম্ভব। কিন্তু ইভিএমে সূক্ষ্ম কারচুপি সম্ভব। বাইরে কোনো হইচই নেই, কিছু নেই, ভেতরে কী হচ্ছে? অন্য সিস্টেমে হলে বাইরেও হইহই হবে। সেটা আরও ভালো করে দেখা যাবে। কারণ কেন্দ্র ক্যাপচার করতে তো পাঁচ-ছয়জন লোকবল লাগবে।’

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ‘ইসি কেন ইভিএম নিয়ে পড়ে আছে সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন। তারা হয়তো মনে করেছে, জনগণের টাকায় কেনা যন্ত্রাংশের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে। কারণ এ যন্ত্র ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে। এটা ঠিক তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের ভোট ব্যালটে করলে একটা ট্রায়াল হয়ে যেত। কিন্তু এখন যদি বাকি চারটি সিটি করেপারেশন নির্বাচন ইভিএম বাদ দিয়ে ব্যালটে করতে চায় তাহলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। কেননা, কেউ যদি রিট করে দেয় তাহলে নির্বাচন আটক যাওয়ার মতো উটকো ঝামেলায় ইসিকে পড়তে হতে পারে।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ইসি কমিশনার মো. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, এটা ইভিএম আর ব্যালট সবক্ষেত্রেই একই নিয়ম। যে ভোটের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ কেন্দ্রে এলে তাদের ভোট নিতে হবে। আর ইভিএমে অনেকে ভোট দিতে অভ্যস্ত না হওয়ায় কারও কারও হয়তো সময় লেগেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে, তা অনেকটা দুর্বল ও নিম্নমানের। এতে ভোট পুনঃগণনার সুযোগ না থাকায় এ ছোট নির্বাচনেই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বড় ভোটের ক্ষেত্রে আরও জটিলতা হতো। এই ইভিএমে যদি পেপার ট্রায়াল থাকত, তাহলে এসব অভিযোগ ওঠার সুযোগ ছিল না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিশন সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দিয়েছে, এখন ব্যালটে বাকি চারটি নির্বাচনে ভোট নেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা সেটি করতে হলে, পুরো প্রক্রিয়া আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত