দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে কৃষি খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ জন্য কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে একাধিক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ব্যাংকগুলোর বার্ষিক কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হয়েছে। ১০ মাসেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলেছে ২৪ ব্যাংক। যদিও কোনো কোনো ব্যাংক এখনো ৪০ শতাংশের কম ঋণ বিতরণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ২৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ ঋণ বিতরণ করতে পেরেছে ২৪ ব্যাংক। তবে অনেক ব্যাংক ঋণ বিতরণে ব্যর্থ হওয়ায় সার্বিক লক্ষ্যমাত্রার ৮৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ঋণ বিতরণ হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। করোনা মহামারী ও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কৃষির গুরুত্ব ব্যাপকহারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে সহায়তা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সচেষ্ট রয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যাংকগুলো যদি এই খাতের প্রতি গুরুত্ব দেয় তবে আসন্ন খাদ্য বা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা বাংলাদেশের জন্য সহজ হয়ে যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে লক্ষ্যমাত্রার ৯২৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে বিদেশি খাতের হাবিব ব্যাংক। চলতি বছর ব্যাংকটিকে ৭ কোটি টাকা বিতরণ করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকটি বিতরণ করেছে ৬৫ কোটি টাকা। এর পরের অবস্থানে থাকা বিদেশি ব্যাংক আল ফালাহ বিতরণ করেছে লক্ষ্যমাত্রার ৩৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। চলতি বছর ২৪ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করার কথা ছিল ব্যাংকটির। কিন্তু ১০ মাসে বিদেশি এই ব্যাংক বিতরণ করেছে ৮৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
২৩৮ শতাংশ ঋণ বিতরণ করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ঢাকা ব্যাংক। ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ছিল ৩৯০ কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকটি ঋণ বিতরণ করেছে ৯২৮ কোটি টাকা। ২০০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করে
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। চলতি বছর ব্যাংকটির শর্ত ছিল ১৪ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ। কিন্তু ১০ মাসেই বিতরণ করেছে ২৮ কোটি টাকা। শতভাগ ঋণ বিতরণের তালিকায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে উরি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, এইচএসবিসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে বিডিবিএল, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এছাড়া বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, এনআরবি, সীমান্ত, এনআরবি কমার্শিয়াল, ওয়ান, প্রাইম, পূবালী, শাহাজালাল ইসলামী, সিটি, ট্রাস্ট, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল (ইউসিবি) এবং উত্তরা ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা ধরা হলেও ব্যাংকগুলো তার চেয়েও বেশি বিতরণ করেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ হাজার ৯১১ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। যার মধ্যে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৮৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। আর চলতি বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ১১ হাজার ৭৫৮ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ১৯ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম ১০ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ১০ হাজার ৯৩৪ কোটি বা লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং বিদেশি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ১৫ হাজার ৯৯৫ কোটি বা লক্ষ্যমাত্রার ৮৩ দশমিক ৫১ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। গত ১০ মাসে
কৃষি ও পল্লীঋণ খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে রাষ্ট্রের বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটি এই সময়ের মধ্যে ঋণ বিতরণ করেছে ৬ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০১ শতাংশের বেশি।
আলোচ্য ১০ মাসে শস্য খাতে বিতরণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা, সেচ সরঞ্জাম কিনতে দেওয়া হয়েছে ২২৪ কোটি, কৃষি সরঞ্জাম কিনতে ১৮২ কোটি, গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগির খামারে ৫ হাজার ৭৫৯ কোটি, মৎস্য খাতে ৩ হাজার ৩১৭ কোটি, শস্য গুদামজাত এবং বিপণনে ১৩৫ কোটি, ব্যক্তিগত খাতে এক হাজার ৬৫১ কোটি এবং অন্যান্য খাতে ২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি (২০২২-২৩) অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ২৬ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার ঋণ শোধ করেছেন কৃষকরা। গত বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ২২ হাজার ২৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় বেড়েছে ৮ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংক খাতে কৃষিঋণের স্থিতি বা পরিমাণ ৫১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ।
