পুঁজিবাজারে প্রয়োজন অপ্রদর্শিত অর্থ

আপডেট : ৩০ মে ২০২৩, ০৫:৫০ এএম

আগামী অর্থবছরের জন্য অপ্রদর্শিত অর্থ ৫ শতাংশ কর দিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এ সুযোগ দেওয়া হলে অপ্রদর্শিত অর্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। অনেক সময় পাচার হয়ে যায়। আগামী অর্থবছরের জন্য কেমন বাজেট চেয়েছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান এ সুপারিশ করেন।

আগামী বাজেটে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের পার্থক্য ১৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ জানিয়ে ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির (ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টেলিকম, টোব্যাকো ইত্যাদি খাত ছাড়া) করহারের পার্থক্য ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর রেয়াত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ যা উদ্যোক্তাদের তালিকাভুক্তির জন্য উৎসাহিত করে না। তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, এতে সরকারের মোট কর আদায় হ্রাস পাবে না, বরং বাড়বে। বর্তমানে বহু প্রতিষ্ঠান আছে অনেক ভালো ব্যবসা করছে। অনেক শিল্পকারখানা আছে তালিকাভুক্ত না হয়েও বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান অনেক সময় হিসাবের চেয়ে কম হারে কর বা ভ্যাট পরিশোধ করে। পুঁজিবাজারের গতিশীলতা ও রাজস্ব বেশি পরিমাণে আদায় করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের পার্থক্য ১৫ শতাংশ হারে নির্ধারণের জন্য সুপারিশ করছি। তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমিয়ে আনতে পারলে ভালো মানের প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত করা যাবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে বলেও মনে করি। 

ছায়েদুর রহমান আরও বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন বিরাজমান যা বেশি পরিমাণের রাজস্ব আদায়ে সহায়ক হবে। এছাড়া বর্তমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর সুবিধা দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ইত্যাদিকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। পুঁজিবাজার নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই আসে ভালো কোম্পানির শেয়ারের অভাব। এ বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কেননা দেশে নিবন্ধিত লিমিটেড কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ২ লাখ কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৩৫৪টি। যা অনেক কম বলে মনে করছি। 

ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, বাস্তবতা হলো ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র আইনগত বাধ্যবাধকতার জন্য তালিকাভুক্তিতে আসে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সহজভাবে ব্যাংকঋণ পেয়ে যায় বলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর সুবিধা তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায় না এবং পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্তির বিষয় বিবেচনা করে না। একটি প্রতিষ্ঠান স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হলে বিভিন্ন ধরনের আইনি কাঠামো পরিপালন করতে বাধ্য হয় এবং ব্যবসার সঠিক তথ্যাদি উপস্থাপন করতে হয়। যেহেতু তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য লভ্যাংশ ঘোষণার একটি বাধ্যবাধকতা আছে। তাই কর বেশি প্রদান করাই বাঞ্ছনীয়। 

মার্চেন্ট ব্যাংকের করপোরেট করহার ২৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ জানিয়ে ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, বিদ্যমান আইনে মার্চেন্ট ব্যাংকের ওপর বর্তমানে মার্চেন্ট ব্যাংকের করহার ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। ব্রোকারের করহার ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির করহার ১৫ শতাংশ।

তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বৃহৎ কর অঞ্চলের আওতাধীন রাখা হয়েছে এবং তার করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যা হতাশার। বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৭টি মার্চেন্ট ব্যাংক কর্মরত আছে। পুঁজিবাজারের ধীরগতি, কভিড-১৯, ব্যবসার সীমাবদ্ধতা থাকায় বেশিরভাগ মার্চেন্ট ব্যাংকের অপারেটিং খরচ চালানোই সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের বৃহৎ কর অঞ্চলে রাখা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো করহার নির্ধারণ অযৌক্তিক এবং টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বৃহৎ কর অঞ্চলে যুক্ত করে জটিল ব্যবস্থাপনায় ফেলা হয়েছে। আমি প্রস্তাব করতে চাই, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে করহার ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে এবং সাধারণ সার্কেলে অ্যাসেসমেন্ট করার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করছি। 

পুঁজিবাজারের গতিশীলতা আনতে লভ্যাংশের ওপর কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করে তিনি বলেন, করপোরেট কর কর্তনের পর লভ্যাংশ প্রদান করা হয়। লভ্যাংশ প্রদানের সময় ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কর্তন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আবার লভ্যাংশ গ্রহীতার ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্নের সময় তার ওপর প্রযোজ্য হারে কর প্রদান করতে হয়। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ গ্রহণ না করে রেকর্ড তারিখের আগেই বিক্রি করে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে না। যা বাজারকে অস্থির করে। এটি দ্বৈত করনীতির আওতায় পড়ে। এক আয়ের ওপর বহুবার কর দিতে হয় ফলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে না। যা পুঁজিবাজারের অস্থিরতার অন্যতম কারণ।

সভাপতি বলেন, আগামী অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার করার সুপারিশ করছি।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির ভ্যাট হার হ্রাস করে ১০ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ জানিয়ে ছায়েদুর রহমান বলেন, তালিকাভুক্ত এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির ভ্যাট হার এক অর্থাৎ ১৫ শতাংশ। এতে সরকারের মোট ভ্যাট হ্রাস পাবে না। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা আছে তালিকাভুক্ত না হয়েও বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করছে। পুঁজিবাজারের গতিশীলতা ও রাজস্ব বেশি পরিমাণে আদায় করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ভ্যাট হার হ্রাস করার জন্য সুপারিশ করছি।  তিনি বলেন, ২০১১ সাল থেকে পুঁজিবাজার বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যান্য আর্থিক সূচক ভালো থাকার পরেও পুঁজিবাজারে তা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। পুঁজিবাজারকে পেছনে রেখে অর্থনৈতিক অগ্রগতি করা সম্ভব না। তাই পুঁজিবাজারে গতিশীলতা আনতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পুঁজিবাজার উন্নয়নে রাজস্ব নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্র্ণ বিষয়। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বৃদ্ধি হয়। তাই আগামী অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত