বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন মাত্র ১২ দিন পরে। জোরেশোরে চলছে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী প্রচারে এগিয়ে আছেন। অন্য প্রার্থীরা নালিশ জানাতে ব্যস্ত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) ৩০টি ওয়ার্ডে নির্বাচন আগামী ১২ জুন। মেয়র, কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে পুরো নগরী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাইকিং চলছে। প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ করছেন।
নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত নগরবাসীকে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন। দিন-রাত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। প্রচার-প্রচারণায় শামিল হয়েছেন তার অর্ধাঙ্গিনী লুনা আবদুল্লাহ। তার কর্মী-সমর্থকদের প্রচারণায় গরম সিটির বিভিন্ন এলাকা।
গতকাল মঙ্গলবার ১ নম্বর ওয়ার্ডের চকবাজার, বাজার রোড, বাঁকলার মোড়ে গণসংযোগ করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি বরিশালকে তিলত্তোমা নগরীতে পরিণত করবেন।
ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার প্রার্থীর প্রচারণায় প্রথম দিন থেকেই মাঠে নেমেছেন ২ হাজার ১০০ নারী কর্মী। প্রতিটি ওয়ার্ডে ৭০ জন করে ৩০টি ওয়ার্ডেই যুগপৎ প্রচারণা শুরু করেছেন তারা। হাতপাখা নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে এমনটাই মনে করছেন অনেকে।
গতকাল সারা দিন নগরীর টেক্সটাইল মোড়, মড়কখোলা পোল, কালিজিরা বাজার, বারুইজ্জার হাট ও বটতলা বাজারে গণসংযোগ করেন ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম এবং তার অনুসারীরা। তারা নগরীর উন্নয়ন এবং নারীদের ইজ্জত রক্ষায় হাতপাখাকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
নগরবাসীকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসেন তাপস। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর বাঁকলার মোড়-বাজার রোডে গণসংযোগকালে তিনি বলেন, ‘কয়েকটি সংস্থা আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে দেনদরবার করছে। নির্বাচন নিয়ে জনসাধারণের প্রশ্ন ও হতাশা এখনো কাটেনি। আমরা শঙ্কিত সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে। স্থানীয় প্রশাসন এখনো পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। তাদের একচোখা আচরণ আমার চোখে পড়েছে।’
বিএনপি নেতা ও সাবেক মেয়র প্রয়াত আহসান হাবিব কামালের ছেলে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন টেবিল-ঘড়ি প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তার নামে নানা অভিযোগ উঠেছে। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রচার-প্রচারণায় বলছেন ‘আমি বলতে পারি ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন যারা ঘড়ি মার্কায় ভোট দেবেন তারা।’ এমন কথায় ক্ষুব্ধ নগর বিএনপি। তারা বলছেন, রুপন দলের (বিএনপির) কেউ নয়। মিডিয়া এবং তিনি নিজে বিএনপির লোক বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে দলের মান ক্ষুণœ হচ্ছে।’
রুপনসহ বরিশাল সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ১৯ বিএনপি নেতাকে বহিষ্কারের সুপারিশ করেছে নগর বিএনপি। বিষয়টি নিশ্চিত করে নগর বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৯ জনের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। মেয়র প্রার্থী রুপন দলের কেউ না হলেও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তাই তার নামও এই তালিকায় এসেছে।’
বিসিসি নির্বাচনে সাত মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্য তিন মেয়র প্রার্থীর প্রচারণা তেমন দৃশ্যমান নয়। আগামী ১২ জুন বরিশাল সিটির ১২৬ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। এবারের নির্বাচনে ভোটার ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৮ জন।
গাজীপুরের ভয় বরিশালের নৌকায় : ‘আমরা গাজীপুর সিটি নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়েছি। অনেক কিছু আমাদের জানার আছে। আমরা জনগণের ভোটে হারিনি, হেরেছি ষড়যন্ত্রের কাছে। বিশ্বাসঘাতকতার কাছে।’ এ মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে বরিশাল মহানগর ও বরিশাল জেলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা জেলা যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নাসিম বলেন, ‘বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কৌশল পাল্টে মানুষের কাছে যাব ভোট ভিক্ষা চাইতে, যাতে ভোটাররা বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমরা আর এসো না, আমরা নৌকায় ভোট দেব। আমরা ঘরে-বাইরে এক ও অভিন্ন আছি। আমাদের ভেতরে কোনো বিভেদ নেই।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দেখবেন আমাদের অগ্রগতি, আমাদের কর্মকাণ্ড। আমরা দ্বারে দ্বারে ভোট ভিক্ষা চাইতে যাব। এই মহানগরের নেতাকর্মীরা, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোট চাওয়া শুরু করেছেন।’
আজ বুধবার সকাল থেকেই বরিশাল মহানগরীর ৩০ ওয়ার্ডের মানুষের কাছে লিফলেট, নির্বাচনী অঙ্গীকার পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাহাউদ্দিন নাসিম বরিশাল আওয়ামী লীগে কোনো দ্বন্দ্ব নেই মন্তব্য করে বলেন, ‘বরিশালের মানুষের কাছে, যুবসমাজের কাছে, ছাত্রমহলের কাছে, মেহনতি মানুষের কাছে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং খোকন সেরনিয়াবাত জনপ্রিয় ব্যক্তি। কিন্তু একটি মহল অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। তারা আমাদের ভেতরে ঐক্য নেই বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।’
মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখ এবং কষ্টে বলতে হয়, আমি অনেকের সহযোগিতা পাইনি। অনেকের কাছ থেকে বিরুদ্ধাচরণ পেয়েছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার আদেশকে আমরা যদি উপেক্ষা করি, তাহলে তা হবে আত্মঘাতী। আমাদের চেষ্টা করা উচিত সাংগঠনিক কার্যকলাপ যেন বিঘ্নিত না হয়।’
বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মো. মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সঞ্চালনায় ও যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধান অতিথি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য মো. গোলাম কবীর রাব্বানী চিনু, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম জাহাঙ্গীর হোসেন, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুছ ও মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত।
মতবিনিময় সভা শেষে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নৌকা প্রতীকের একটি মিছিল বের হয়।
