বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানায় মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমলেও ব্যয় বাড়ছে। সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে না পেরে অনেকে জরিমানা গুনছেন, আবার কারও অর্ডার বাতিল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোমতে টিকে থাকলেও ছোটগুলোর অবস্থা খুবই করুণ।
বিদ্যুতের অভাবে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার পানির উৎপাদনও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত পরিবহন চালকসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন পেশার মানুষের আয় কমেছে লোডশেডিংয়ের কারণে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অফিস-আদালতে কাজে বিঘ্ন ঘটছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখাতেও ক্ষতি হচ্ছে। এমন নানামুখী সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সে তুলনায় উৎপাদন না হওয়ায় লোডশেডিং বাড়ছে সারা দেশে। খোদ রাজধানীতেই ৫-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ঢাকার বাইরে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া গেছে। সরকারি হিসাবে বিদ্যুতের ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও বাস্তবে এর পরিমাণ ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট হবে বলে খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানিয়েছেন।
চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতি ঠিক হতে আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে এখন ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। পরিস্থিতি যে অসহনীয় তা জানি। দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে গত বছরের জুলাইয়ের মতো সূচি করে পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের চিন্তা আপাতত নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম যে এ রকম একটা পরিস্থিতি হতে পারে। সেটার সমাধান নিয়ে গত দুই মাস ধরে চেষ্টা করছি। তবে আমাদের অনেক কিছু দেখতে হয়। অর্থনৈতিক বিষয়, সময়মতো এলসি খোলা ও জ্বালানি পাওয়ার বিষয় আছে। আমাদের কয়লার জোগান দিতে হচ্ছে, তেলের জোগান দিতে হচ্ছে, গ্যাসের জোগান দিতে হচ্ছে। আবার শিল্পে গ্যাস দিতে হচ্ছে। সেই বিষয়গুলোকে আমাদের একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি থাকলেও তাপপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানির অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা যাচ্ছে না। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে আশা করছি। সবাইকে আরেকটু ধৈর্য ধরতে হবে।’
নিট পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ জ্বালানির কারণে কারখানায় মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আমরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। সরকার দাবি করছে রপ্তানি আয় বাড়ছে। ফলে আমাদের কষ্টের কথা বলে কোনো লাভ নেই।’
তিনি বলেন, ‘সারা দিনে অন্তত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকছে। একজন কারখানার মালিক শনিবার আমার কাছে এসে জানালেন, লোডশেডিংয়ের কারণে তার প্রতিদিন এক লাখ টাকার বাড়তি তেল কিনতে হচ্ছে। বৈশ্বিক কারণে এমনিতেই বিদেশি ক্রেতার অর্ডার কমে গেছে। এরপরও ঠিকমতো গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। সবমিলে আগের চেয়ে কারখানার উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক কারখানার মালিককে জরিমানা দিতে হচ্ছে। অর্ডার বাতিল হচ্ছে অনেকের।’
নারায়ণগঞ্জের মদনপুরের জাহিন নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দীন জানান, ঠিকমতো বিদ্যুৎ থাকে না। আবার নিজস্ব ব্যবস্থায় ক্যাপটিভ প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কারখানা চালানোর গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না। লোডশেডিংয়ের কারণে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলি এলাকার রাজ গ্রুপের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন জানান, গ্যাসের অভাবে গত মাসে ১০ থেকে ১২ দিন কারখানা বন্ধ ছিল। এখন আবার শুরু হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ফলে ক্রেতার চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। গরমের কারণে তিন ঘণ্টার বেশি ডিজেল জেনারেটর চালানো কষ্টকর। তাছাড়া এটি অনেক ব্যয়বহুল।
তৈরি পোশাক কারখানার পাশাপাশি সিরামিক শিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে। এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিরামিক তৈরির জন্য চুল্লির তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগে। তার আগেই যদি বিদ্যুৎ চলে যায় তাহলে আবার নতুন করে চুল্লি গরম করতে হয়। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
গাজীপুরের ছয়দানা মালেকের বাড়ি এলাকার স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দিনে গড়ে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। পণ্য তৈরি করা অবস্থায় বিদ্যুৎ চলে গেলে রং ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে তা বিক্রির অনুপযোগী হয়ে যায়। এতে করে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন নষ্ট হচ্ছে। নিজস্ব জেনারেটরও নষ্ট হওয়ার পথে। শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। এভাবে লোডশেডিং চললে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও অটোরিকশার মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে তাদেরও আয় কমেছে।
চুয়াডাঙ্গার একজন অটোরিকশা চালক শরিফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের ভেলকিবাজির কারণে অটোরিকশার ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না। অল্প অল্প করে চার্জ দেওয়ার কারণে বেশিক্ষণ গাড়ি চালানো যায় না। এতে আয় অর্ধেকে নেমেছে। আবার ব্যাটারির ওপরও চাপ বাড়ছে। অনেক সময় মাঝপথে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায় চার্জের অভাবে। তখন ভোগান্তির আর শেষ থাকে না।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা এলাকায় অবস্থিত বেগ রাইস মিলের মালিক জাহিদ হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, আগে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা তার কারখানায় ধান ভাঙানো হতো। কিন্তু এখন ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টাও মিল চালু রাখতে পারছেন না। মিলের চারজন শ্রমিকের প্রতিদিনের হাজিরা বাবদ ২৮০০ টাকাও আয় হয় না। অন্যান্য খরচ তো রয়েছেই। সব মিলে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিদ্যুতের অবস্থার উন্নতি না হলে মিল চালানো সম্ভব হবে না।
ঢাকা ওয়াসা সূত্র জানায়, চাহিদা অনুযায়ী রাজধানীতে প্রতিদিন ২৬৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করত প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে ১৮৫ লিটারে। এর ফলে অনেক এলাকায় ঠিকমতো পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এরফলে বনানী, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ের মধ্যে পানি না পেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
মোহাম্মদপুর পশ্চিম কাটাসুরের বাসিন্দা হাজি মোহাম্মদ ইউনুস জানান, দুদিন ধরে তার বাসায় পানি নেই। অপেক্ষার এক পর্যায়ে রবিবার ওয়াসার কার্যালয়ে গেলে তাকে জানানো হয় বিদ্যুতের অভাবে ঠিকমতো পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ওয়াসার গাড়ি থেকে পানি কেনার পরামর্শ দিলে তিনি রাজি হন। কিন্তু দীর্ঘ সিরিয়াল হওয়ায় তিনি ওই তালিকায় নাম লেখাতে পারেননি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘আজকের এই পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতির চেয়ে সরকার বেশি দায়ী। ভুলনীতির কারণে প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান না করে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে। এতে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে দফায় দফায়। অতিরিক্ত দাম দিয়েও মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। সামনে লোডশেডিং আরও বাড়বে।’
