দরপত্রের দর জানিয়ে কমিশন নেন তিনি

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৩, ০৫:৩৮ এএম

ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি দরপত্রের গোপন মূল্য বা ‘রেট শিডিউল’ ফাঁস করে দেন। পুরুত্ব কম ও নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের নির্মিত সড়কে বিল পরিশোধ করেছেন দেদার। কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল ও জামানতের চেক পরিশোধের ক্ষেত্রে গুনে গুনে বুঝে নেন কমিশন। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে হয়েছে বিভাগীয় মামলা। প্রমাণিত হয়েছে তার দুর্নীতি; তবুও শাস্তি হয়নি।

ঠিকাদারদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান প্রকৌশলী দুই দফা তাকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ করলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। অভিযোগ আছে মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের জোরে বেঁচে যাচ্ছেন বারবার। ক্ষতমতাধর এই ব্যক্তি হলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পিরোজপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তার হাওলাদার। তার ব্যাপারে এখন আর কিছু করতে নারাজ সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী। কিছু বললে বা করার চেষ্টায় হারাতে পারেন নিজের পদও। এ জন্য ওই প্রকৌশলীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চলছেন সংস্থার প্রধানও। 

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তার হাওলাদার বর্তমান কর্মস্থলের আগে পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। বরগুনা তার নিজের বাড়ি আর পটুয়াখালী শ^শুরবাড়ি। এ সময় ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ দেওয়া, নিম্নমানের কাজে বিল ছাড় ও জামানতের চেক ছাড়ে কমিশন বাণিজ্যে রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। সেই সময় গ্রামীণ সড়কের আইডি ব্যবহার করে অবৈধভাবে এলজিইডির বরাদ্দ করে সদর পৌরসভায় শ^শুরবাড়ি সড়কের আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছেন। এর আগে বরগুনার সহকারী প্রকৌশলী থাকাবস্থায় জেলার সরকারি বরাদ্দের দুর্যোগ শেড, ব্রিজ, মসজিদ, মাটির কেল্লা নির্মাণ করেছেন নিজ বাড়ি ও স্বজনদের বাড়ির আশপাশে। যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। সব বাধা মাড়িয়ে দুর্বার গতিতে লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন প্রকৌশলী সাত্তার। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে গর্ব করে বলেনও, যত দিন এই সিন্ডিকেট আছে; তত দিন প্রধান প্রকৌশলী বা অধিদপ্তরের কেউ তাকে কিছইু করতে পারবেন না।

তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২১ সালের ১১ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের তৎকালীন সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ ওই প্রকৌশলীকে একটি নোটিস পাঠান। সেখানে বলা হয়, ‘আপনার কার্যক্রম সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার পর্যায়ভুক্ত অপরাধ। কেননা আপনি পটুয়াখালী জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাবস্থায় পটুয়াখালী সদর উপজেলার কাশিপুর বাজার এলাকার সড়কের নির্মাণকাজে বিটুমিন ৫.০-৫.৫ ভাগের স্থলে ৩.৬ ভাগ, ৪.৫ ভাগ ও ৩.৪ ভাগ এবং পুরুত্ব ৪০ মিলিমিটারের স্থলে ৩৬ মিলিমিটার করেছেন। যেহেতু আপনি অবৈধভাবে আর্থিক লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের সঙ্গে পরস্পর যোগসাজশে বর্ণিত ত্রুটিপূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন করেছেন। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো। এরপর তাকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা জানাতে বলা হয়। এ ঘটনার পর প্রকৌশলী সাত্তারের সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং দুর্নীতি প্রমাণের পরও শাস্তি থেকে বেঁচে যান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ থেকে ২০২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবদুস সাত্তার হাওলাদার পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময়ও কয়েকজন ঠিকাদার এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, যেকোনো কাজের ৫-৭ পার্সেন্ট কমিশন দিতে হয়েছে তাকে। নইলে ওই ঠিকাদারকে কাজ দেননি। যারা তার প্রস্তাবে সম্মত হতেন তাদের গোপনে ‘রেট শিডিউল’ দিয়ে দিতেন; যার ফলে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেয়ে যেত। এরপর ঠিকাদারকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দিতে এক থেকে দেড় পার্সেন্ট নিতেন। আর জামানতের চেক ফেরতের সময়ও দেড় পার্সেন্ট কমিশন আদায় করতেন। পটুয়াখালী সদর উপজেলায় শ^শুরবাড়ি হওয়ায় পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে সড়ক ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করছেন; গ্রামীণ জনপদের সড়কের আইডি নম্বর ব্যবহার করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৩৭ নম্বর নোটিসে উপজেলার ৫৭৮৯৫২০০৪ নম্বর আইডি ব্যবহার করে অবৈধভাবে ওই কাজ বাস্তবায়ন করেছেন। 

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তারের বাবা স্বল্প আয়ের চাকুরে ছিলেন। তাদের পরিবারও নিম্নবিত্ত। তিনি ছাড়া পরিবারের আর কেউ বড় কোনো চাকরি করেন না। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কমিশন বাণিজ্য করে এখন তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। এলাকায় প্রভাব বিস্তারে তার ভাই মনিরুল ইসলামকে বরগুনার আমতলী উপজেলার ১ নম্বর গুলিসাখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছেন। বড় ছেলে এইচ এম মনজুরুল ইসলাম রিফাত আমতলী উপজেলা ও রমনা থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি এবং ছোট ছেলে ফজলে রাব্বি রিমন বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি। আগে থেকে এদের তিনজনের কারোর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও নেই। প্রকৌশলী সাত্তারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারের অবস্থান অল্প সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে।

এলজিইডির সদর দপ্তরে পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুর থেকে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে। সেগুলোর যাচাই-বাছাইয়ে অনেক অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তার হাওলাদারের পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৩টি গাড়ি ব্যবহার করছেন। সেগুলো হলো ঢাকা মেট্রো-গ ৪৩৯১০০; এটা ছোট ছেলে ব্যবহার করেন। হোন্ডা ভ্যাজেল ঢাকা-শ-৪৬৯; এটা বড় ছেলে ব্যবহার করেন। আর টয়োটা নোয়া ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৩৪৯২; তার ভাই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ব্যবহার করেন। এর মধ্যে পরের দুটো গাড়ি শো-রুমের নম্বরে ব্যবহার করে তারা চালাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীর ছোট ছেলে ফজলে রাব্বি রিমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারের কারোর নামে গাড়ির নিবন্ধন নেই। তাহলে ওই গাড়ি যে আমাদের, সেটা আপনি বলতে পারেন না।’ 

অভিযোগের আরও সত্যতা মিলেছে, বরগুনায় দায়িত্ব পালনকালে সরকারি টাকায় নিজ বাড়িতে তৈরি করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বরগুনায় দায়িত্ব পালনকালে ছয়টি মাটির কেল্লা নির্মাণের অর্থ বরাদ্দ ছিল। ওই বরাদ্দের তিনটি করেছেন নিজ এলাকায়; বাকি তিনটি করেছেন নিজ স্বজনদের এলাকায়। চাচা ও নানাবাড়ির সামনে নির্মাণ করেছেন পাঁচটি কালভার্ট। গুলিসাখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদেশি দাতা সংস্থা ২০১১-১২ অর্থবছরে তিনতলা দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য অর্থ বরাদ্দ হলেও সেটাও নির্মাণ করেছেন নিজ এলাকায়। বিদেশি সহায়তা ফান্ডের টাকায় নিজ বাড়িতে তৈরি করেছেন মসজিদ।

এলজিইডির সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, আবদুস সাত্তার হাওলাদার বর্তমান কর্মস্থল পিরোজপুরেও তার পুরনো চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। কাজের কমিশন আদায়ের পাশাপাশি একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন ব্যবসায়িক গোপন অংশীদারত্ব। তার লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে এলজিইডি সদর দপ্তরে। এসব কারণে গত ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে পিরোজপুর থেকে ফরিদপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। এর আগে একই ধরনের অভিযোগের কারণে তাকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এলজিইডির সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। অবাক করা বিষয় হলেও সত্য, এই দুটো বদলির কোথাও তাকে যোগদান করতে হয়নি। তার আগেই মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ওই কর্মকর্তা ও অসাধু সিন্ডিকেট তাকে বর্তমান কর্মস্থলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।

এ বিষয়ে আমতলী উপজেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং ১ নম্বর গুলিসাখালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তার হাওলাদার এই ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের আর্থিক অবস্থা আগে তেমন ভালো ছিল না; হঠাৎ অবস্থার উন্নতি করেছেন। সাত্তার ছাড়া পরিবারের অন্যরা বড় কোনো ব্যবসা বা চাকরি করেন না। এমন একটি পরিবারের সদস্যরা এখন তিনটি গাড়ি ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, আবদুস সাত্তারের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং তার পরিবারের অত্যাচারে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। এলজিইডি সদর দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগও দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি প্রমাণও হয়েছে। তবুও শাস্তি হয়নি। মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না এলজিইডি সদর দপ্তর।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হয় এলজিইডির পিরোজপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তার হাওলাদারের সঙ্গে। ফোন রিসিভ করে দেশ রূপান্তর প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর জরুরি সভায় রয়েছেন, পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। তিনি কল ব্যাক না করায় পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এসব বিষয়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিনের কাছে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বিস্তারিত লিখে এসএমএস করলেও সাড়া দেননি। এলজিইডি সদর দপ্তরে গিয়ে মতামত জানার চেষ্টা করলেও তার সাক্ষাৎ মেলেনি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. হেমায়েত আকবর টিপুর সহযোগিতা চেয়েও তার মতামত জানা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এলজিইডির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে উন্নয়ন অনুবিভাগ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তার হাওলাদারের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তিনি লিখিত কোনো অভিযোগ পাননি। এমন কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারোর ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত