এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজারে এবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খড়গ নেমেছে। ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকা মন্দার বাজার থেকে রাজস্ব আয় বাড়াতে মূলধনি মুনাফার ওপর কর ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। নতুন কর আইনের খসড়ায় এমন প্রস্তাব রেখেছে এনবিআর। তবে প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ বলছে, ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর মূলধনি মুনাফার ওপর কর প্রত্যাহার অব্যাহত থাকবে। আরেক পক্ষ বলছে, অন্য আইনে যা-ই থাকুক নতুন আইন প্রাধান্য পাবে। এমন বিভ্রান্তির মধ্যে গতকাল দেশের পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হয়েছে, যা গত সাড়ে ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপ এমন সময়ে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, যখন তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ধীরে ধীরে ফ্লোর প্রাইস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। বাজার পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে চাঙ্গা হচ্ছিল এবং প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দৈনিক লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আইনটি এখনো সংসদে উপস্থাপন না হলেও এমন করারোপের খবরে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে নিজেদের পোর্টফোলিও খালি করার উদ্যোগ নিয়েছেন, যার প্রভাব গতকালের লেনদেনে দেখা গেছে।
জানা গেছে, আগামী দুই-একদিনের মধ্যে সরকার আয়কর আইন, ২০২৩ এর প্রস্তাব (বিল) সংসদে তুলতে যাচ্ছে। এ বিলের সপ্তম তফসিলের ১ ধারায় বলা হয়েছে, কোম্পানির ক্ষেত্রে মূলধনি মুনাফার ওপর করহার হবে ১৫ শতাংশ। কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য করদাতা (যেমন ব্যক্তি ইত্যাদি) পরিসম্পদ অর্জনের পাঁচ বছর পর বিক্রি করে মুনাফা পেলে তাকেও মূলধনি মুনাফার ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। তবে পাঁচ বছরের কম সময়ের মধ্যে কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পরিসম্পদ বিক্রি করে মুনাফা করলে, তা তার মোট আয়ে যুক্ত হবে এবং মোট আয়ে প্রযোজ্য হারে কর দিতে হবে। আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন এই আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে বলে প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে।
বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা জানান, শেয়ার কেনাবেচা থেকে অর্জিত আয়ও মূলধনি মুনাফা। এখন কোম্পানির ক্ষেত্রে মূলধনি মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হতো। প্রস্তাবিত আইনে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে এনবিআর একটি এসআরও জারি করে পুঁজিবাজার থেকে অর্জিত ব্যক্তির মূলধনি মুনাফার ওপর কর প্রত্যাহার করা হয়। প্রস্তাবিত আইনে এ ধারা ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে, যা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তবে কর বিশেষজ্ঞ ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট স্নেহাশীষ বড়–য়া গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু আছে বলে মনে করি না। প্রথমত ‘কর আইন ২০২৩’ এখনো আইন নয়, কারণ সংসদে পাস হওয়া তো দূরের কথা, উত্থাপনই হয়নি। তাছাড়া প্রস্তাব উত্থাপন হলেও পাস না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না, এটি আইন। যদি এটি পাস হয়ও তারপরও ব্যক্তির মূলধনি মুনাফার ওপর কর প্রত্যাহার করে ২০১৫ সালে জারি করা এসআরওটি নতুন এসআরও জারি করে বাতিল করা না হলে তা কার্যকর হবে না।
ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ রহিত করে এ আইন হচ্ছে। ফলে আগের অধ্যাদেশের অধীন যে এসআরও জারি হয়েছে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা। আইনটি যখনই সংসদে উঠবে, তখনই পুঁজিবাজারে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে, মঙ্গলবারের দরপতন দেখে তা সহজে অনুমান করা যায়। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরির আগেই সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে এ আইনটি হবে না এমন আশ^াস আসা প্রয়োজন।
ডিবিএ সভাপতি আরও বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এমন কোনো পর্যায়ে উন্নীত হয়নি, যেখানে ব্যক্তির মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপ করতে হবে। এ বাজারে এখানো বেশিরভাগ শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে আটকে আছে। অন্তত ৭০ শতাংশ শেয়ারের ক্রেতা নেই। এ অবস্থায় সরকারের দায়িত্বশীল মহলের কোনো নীতি-পরিকল্পনা করার সময় এগুলো বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল।
এদিকে মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপের প্রস্তাবের খবর ছড়িয়ে পড়লে বড় দরপতনের মুখে পড়েছে বাজার। ফ্লোর প্রাইসের কারণে গত কয়েক মাস সূচকের ওঠানামা ৫-১০ পয়েন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গতকাল ডিএসইএক্স একদিনেই ৪০ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৩১৬ পয়েন্টে নেমেছে। এমন দরপতন গত বছরের ২০ নভেম্বরের পর বা সাড়ে ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওইদিন সূচক হারিয়েছিল ৫০ পয়েন্ট। মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপ হচ্ছে দুপুরে এমন খবর ছড়ালে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দরপতনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাপক বিক্রির চাপে অধিকাংশ শেয়ার দর হারিয়েছে। এমন দরপতনের কারণে লেনদেন হওয়া ৩৬৪ শেয়ারের মধ্যে মাত্র ২৫টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৫৭টির। বাকি শেয়ারগুলো ফ্লোর প্রাইসে পড়েছিল। কেনাবেচা হয়েছে এক হাজার ৮৭ কোটি টাকার শেয়ার, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ১৭০ কোটি টাকা কম।
এদিকে মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপের খবর ফাঁসের পর গতকাল দুপুরে যখন পুঁজিবাজারে বড় দরপতন চলছিল, তখন বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ মো. হাসান বাবু দাবি করেন, এমন করারোপ করা হচ্ছে জেনে আগেভাগেই এনবিআর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিএসইসির চেয়ারম্যান এবং পরিকল্পনামন্ত্রীকে এ কর আরোপ না করার জন্য অনুরোধ জানাই। আশার কথা, তারা তা শুনেছেন এবং বাজেটে এমন কিছু নেই। তিনি বলেন, এটা ঠিক এ বছর বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কিছু নেই। তবে বাজেটে নতুন করে করারোপ করা হয়নি, এটাও ভালো দিক। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে পুঁজিবাজার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
