মানুষের মহৎ কর্মই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাদের জীবনাদর্শ অনুকরণ ও অনুসরণ করে পরের প্রজন্ম। আব্রাহাম লিংকন ছিলেন এমনই একজন, যিনি স্বীয় কর্মগুণেই স্মরণীয়, অনুসরণীয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়ে। তার হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশ করেছিল নতুন যুগে। লিখেছেন সিফাত রাব্বানী
আব্রাহাম লিংকন, সব বয়সীদের কাছেই নানা কারণে স্মরণীয় এক নাম। তিনি দাসপ্রথার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন আলোর মুখ দেখিয়েছিলেন। আজকের যুক্তরাষ্ট্রের যে বহুজাতিক রূপ দেখতে পাই আমরা তার সূচনা ঘটেছিল আব্রাহাম লিংকনের হাত ধরেই। ২৭২ শব্দের আর ২ মিনিট স্থায়িত্বের বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণে তিনি জাতিকে দিয়েছেন নতুন দিশা।
আব্রাহাম লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম অংশে কেন্টাকি রাজ্যের হার্ডিন কাউন্টিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা টমাস লিংকন ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি। তাদের বাড়িটি ছিল কাঠের, তাতে ছিল একটিমাত্র ঘর। টমাস লিংকন ছিলেন নিরক্ষর, নিজের নামটাও ভালোভাবে পড়তে পারতেন না। অতিকষ্টে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তাকে সংসার চালাতে হতো। লিংকনের বয়স যখন মাত্র নয় বছর তখন তার মা এক অদ্ভুত দুগ্ধজাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু পরে জানা যায় তার মা যে গাভীর দুধ পান করেছিলেন সেই গাভীটি বিষাক্ত কোনো ঘাস বা গাছ খেয়েছিল, যার ফলে সেটার দুধেও বিষ ছিল এবং এই দুধ পানেই মৃত্যু হয়েছিল তার মায়ের। শুরু হয় দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে মাতৃহীন আব্রাহাম লিংকনের সংগ্রামী জীবন। এই সংগ্রামে বিজয়ী হন তিনি। হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এ জন্য আব্রাহাম লিংকন সম্পর্কে বলা হয়, `From log cabin to white house’।
শিক্ষাজীবন
লিংকন ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি, জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি নিজে নিজেই পড়াশোনা করেছেন। সব মিলিয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সময়কাল মাত্র ১৮ মাস। তিনি পড়তে খুব ভালোবাসতেন। কোনো কিছু জানার দরকার ও ইচ্ছা হলে তিনি বই পড়ে জেনে নিয়েছেন। প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে বই সংগ্রহ করে তিনি তার পড়ার পিপাসা মেটাতেন। কেবল তাই নয়, গ্রাম থেকে যখনই কেউ শহরে যেত, তিনি তাদের দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের বই আনাতেন। তিনি যখন মাঠে বা জঙ্গলে কাজে যেতেন সেই সময় তার সঙ্গে থাকত বই। যেমন যখন তার মনে হয়েছে তিনি উকিল হবেন তখন তিনি নিজে নিজেই ওকালতির পড়া পড়েছেন।
কর্মজীবন
যে বয়সে শিশুরা নিজের মনে খেলা করে বেড়ায়, মায়ের কোলে বসে গল্প শোনে সেই বয়সেই তিনি বাবার সঙ্গে জঙ্গলে যেতেন কাঠ কাটতে। জমি চাষের কাজেও বাবাকে সাহায্য করতেন শিশু লিংকন। নানা ধরনের কাজই আব্রাহাম লিংকনকে করতে হয়েছে জীবনে। প্রথমে খেয়া নৌকার কাজ নেন। নৌকার মালিকের অনেক বই ছিল। সেই আকর্ষণেই খেয়া নৌকার কাজ নিয়েছিলেন লিংকন। সব বই যখন তার পড়া হয়ে গেল তিনি তখন সে কাজ ছেড়ে দিলেন। তারপর আস্তাবলে, কসাইখানায়, প্রতিবেশীর খামারে, মুদির দোকানে এ রকম আরও বহু বিচিত্র জায়গায় কাজ করেছেন তিনি। পরিণত বয়সে তিনি একটি পোস্ট অফিসে কাজ করতেন। সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওই অফিসে চাকরি করেন।
১৮৪৬ সালে আব্রাহাম লিংকন ইলিনয়ের হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ নির্বাচিত হন। এরপর রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে আইনজীবী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। ১৮৫৪ সালে ডেমোক্রেটিক দল প্রেইরি ল্যান্ডে দাসপ্রথা চালু করলে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং দাসপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ‘লিংকন ডগলাস বিতর্ক’ এবং কৃতদাস প্রথা সম্পর্কে ক্যানসাস- নেব্রাস্কা আইনের ওপর বিতর্ক অল্পদিনের মধ্যেই লিংকনকে জাতীয় খ্যাতি এনে দেয়। ১৮৬০ সালের ৬ নভেম্বর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
তিনি বহু বছর ধরে চলে আসা দাসপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ চলার মধ্যেই তিনি ১৮৬৩ সালে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রায় ৩৫ লাখ ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে এর থেকে বড় বিজয় আর নেই।
বিখ্যাত ভাষণ ও চিঠি
আমেরিকায় গৃহযুদ্ধে প্রায় আট হাজার লোক মারা গেলে তার চার মাস পরে তাদের জন্য নির্মিত স্মৃতিসৌধে যে ভাষণ দেন তা শুধু আমেরিকার জনগণই আলোড়িত হয়নি, আলোড়িত হয়েছিল গোটা বিশ্ব। ভাষণে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই শহীদেরা যারা বিশ্বাস করতেন সব মানুষ সমান তাদের ত্যাগ ব্যর্থ হবে না। তিনি এমন একটি সরকার গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যা হবে জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার হবে এবং কাজ করবে জনগণের জন্য। প্রধান শিক্ষকের কাছে লেখা তার চিঠিতে তিনি চেয়েছিলেন সন্তান যেন আদর্শবান হয়। তিনি সন্তানকে ন্যায়পরায়ণ হওয়ার শিক্ষা দিতে বলেছিলেন। টাকা যেন উপার্জন করতে শেখে, সেই বোধ গেঁথে দিতে বলেছেন। পরীক্ষায় নকল করার চেয়ে অকৃতকার্য হওয়া উত্তম এই ধারণা জাগ্রত করতে বলেছেন। সবশেষে বলেছিলেন সন্তান যেন নিজের প্রতি আস্থা রাখতে শেখে তাহলেই তার আস্থা থাকবে মানুষের ওপর।
আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তার স্বীয় মর্যাদা। মানুষের পক্ষে এবং দাসপ্রথার বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম মানুষের অধিকার নিয়ে যারা কাজ করে চলেছেন তাদের জন্য আজীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
বিখ্যাত উক্তি
‘আজকে ফাঁকি দিয়ে তুমি আগামীকালের দায়িত্ব থেকে পালাতে পারবে না’।
‘বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী ব্যালট’।
‘গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য সরকার’।
