তদন্ত না করেই প্রতিবেদন ইসির

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৩, ০৬:০৫ এএম

নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসির) প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে যাওয়া ১২টি দলের মাঠের কার্যক্রম খতিয়ে দেখার (তদন্তের) শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। আগামী ১০ জুনের মধ্যে সারা দেশের প্রতিবেদন আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন অফিসে পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে। অতঃপর আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে জুনের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ করবে ইসি।

কমিশনের নির্বাচনী রোডম্যাপে জুনের মধ্যেই এ কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বলা হয়েছিল, ৪ জুনের মধ্যে নিবন্ধিত দলের গেজেট প্রকাশ করা হবে। তবে ৫ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কারণে এ বিষয়ে ঢিলেঢালাভাবে কাজ চলছে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে। এরমধ্যে মাঠ পর্র্যায়ের তদন্ত সঠিকভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে কয়েকটি দল। ওই দলগুলোর নেতাদের মতে, ইসি দলগুলোর আদর্শ দেখে কাজ করছে শুধু।

ইসির প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে যাওয়া অন্তত ৪টি রাজনৈতিক দলের নেতারা দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, অধিকাংশ স্থানেই তদন্ত করতে গিয়ে বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত দিতে চাইছেন না তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তদন্ত না করেই কয়েকটি জায়গায় প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন ইসির দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভোলার অফিস দেখানো হয়েছে জেলার লালমোহন লঞ্চঘাট এলাকায়। সেখানে তদন্তে যাওয়ার কথা থাকলেও তদন্তকারী কোনো কর্মকর্তা যাননি। একইভাবে পটুয়াখালী জেলার অফিস দেখানো হয়েছে মির্জাগঞ্জ উপজেলায়। সেখানেও কোনো তদন্তকারী কর্মকর্তা যাননি। নির্ধারিত সময়ের পর লেবার পার্টির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তাদের জানানো হয়, প্রতিবেদন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্তের আগে সাভার, কেরানীগঞ্জ, ধামরাই উপজেলায় লেবার পার্টিকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব বিষয় জানিয়ে দলটির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিরোজপুরে জেলা অফিসে তদন্ত করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রাত ৯টায় ফোন দিয়েছেন। আমরা ৭/৮ মাস আগে আবেদন করেছি। কোনো কারণে অফিস বদলেছে, কিন্তু আগের ঠিকানায় গিয়েই প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে অনেক জায়গায়। এমনও হয়েছে নিচতলায় অফিস, অথচ ৬ তলার সব ফ্লোরে গিয়ে নক করে অন্যদের বিরক্ত করা হয়েছে।’

নানা অভিযোগ নিয়ে গত ২৪ মে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। তারা বলেছে, পরিদর্শন ও যাচাইকালে জেলা, উপজেলা ও থানা নির্বাচনী কর্মকর্তারা যেসব বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চেয়েছেন এবি পার্টির সংশ্লিষ্ট শাখার নেতারা তা দেখিয়েছেন। কিন্তু কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক, অপেশাদার, অনৈতিক, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট, হয়রানিমূলক আচরণ করেছেন। কমিশনের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে দেখা করে তারা সিইসিকে উদ্দেশ করে প্রতিবেদন জমা দেন।

দলটির সদস্য সচিব মুজিবুর রহমান মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাচাইয়ের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু যাচাইয়ে বেশ কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। সেসব নির্বাচন কমিশনের কাছে দিয়েছি। কিন্তু আমরা কোনো সদুত্তর পাইনি।’

বাংলাদেশ পিপলস পার্টির (বিপিপি) চেয়ারম্যান বাবুল সরদার চাখারী জানান, ‘আমাদের কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা অফিসে যায়নি তদন্তকারী দল।’ তিনি বলেন, ‘পুনরায় তদন্ত চেয়ে ২২ মে ইসির কাছে আবেদন করেছি। আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো উত্তর পাইনি।’

সরকার-সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে ইসি ফেভার দিচ্ছে এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের নানা বিষয় নিয়ে অহেতুক হয়রানি করা হচ্ছে। অথচ গণ অধিকার পরিষদ বা বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির কাজ সুন্দর মতো হয়ে যাচ্ছে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী মাইজভাণ্ডারী। তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা ও তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভা-ারীর ভাই। এই পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় রাজধানীর মিরপুর-১-এ। গণ অধিকার পরিষদ হচ্ছে কোটাবিরোধী আন্দোলন করে আলোচনায় আসা ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরের দল। তিনি এই দলের সদস্য সচিব। দলটির আহ্বায়ক আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া।

বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী এম. নাজিম উদ্দিন আল আজাদ জানান, ‘নিবন্ধনের জন্য তার দলের সব জেলা-উপজেলা অফিসে নির্বাচনী কর্মকর্তারা গিয়েছেন। তাদের মালিবাগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও জেলা ইসির প্রতিনিধিদল এসেছে।’ তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চলছে বলেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. জাহাংগীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা দলগুলোর জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অফিস পরিদর্শনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সপ্তাহে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা হয়তো পাওয়া যাবে। পরে কমিশনের সভায় আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হবে। রোডম্যাপ অনুযায়ী জুনেই কাজটি শেষ করতে চাই আমরা।’

নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা ৯৩টি দলের মধ্যে ১২টি নতুন রাজনৈতিক দলের নাম প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছিল ইসি। এগুলো হলো নাগরিক ঐক্য, সনাতন পার্টি, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি (বিপিপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিপি), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম), বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি, মাইনরিটি জনতা পার্টি ও বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি।

কমিশনের আইন অনুযায়ী নতুন দলের জন্য শর্ত হলো দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় ও অন্তত ১০০টি উপজেলায় বা মেট্রোপলিটন থানায় কার্যালয় থাকতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় দলের সদস্য হিসেবে ন্যূনতম ২০০ ভোটার থাকতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত