পাওনা টাকার অপেক্ষায় ৬২ হাজার আবেদন

আপডেট : ১০ জুন ২০২৩, ০৫:২৩ এএম

দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশিরভাগই এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও খুব বেশি নয়। ফলে তাদের শেষ জীবনের প্রত্যাশা অবসর ও কল্যাণ ভাতা। কিন্তু অর্থসংকটে চাকরি থেকে অবসরের তিন-চার বছরেও অবসর ও কল্যাণ ভাতা পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। বর্তমানে প্রায় ৬২ হাজার আবেদনের স্তূপ জমে আছে।

জানা যায়, প্রায় ৩২ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষক অবসরে যান। আর মাসে অবসর ও কল্যাণ ভাতার জন্য প্রায় ৮০০ আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু একজন শিক্ষক মাসে ১০ শতাংশ হিসেবে এই তহবিলে যে টাকা জমা দেন, তা দিয়ে পাওনাদার অর্ধেক শিক্ষককে টাকা দেওয়া যায়। বাকি অর্ধেক টাকা সরকার নিয়মিতভাবে না দেওয়ায় জমা পড়া আবেদনের সংখ্যা বাড়ছে। 

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে জমে রয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার আবেদন। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীরা এখন পাওনা টাকার জন্য ঘুরছেন। আর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে জমে আছে প্রায় ২৪ হাজার আবেদন। ২০২১ সালের মে মাসের পর আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীরা এখনো কল্যাণের টাকা পাননি।   

প্রতি মাসে অবসরে যাওয়া প্রায় ৮০০ শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর সুবিধার জন্য প্রায় ৯০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। প্রতি মাসে ৬ শতাংশ জমাকৃত টাকা থেকে আসে ৬৫ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি থাকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সেই হিসেবে প্রতি বছর জমাকৃত ৯ হাজার ৬০০ আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা। শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা জমা হয় ৬৮০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি থেকে যায় ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমানে যে ৩৮ হাজার আবেদন জমে রয়েছে, তা দিতে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রয়োজন।

অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মচারীরা কল্যাণ ট্রাস্টে প্রতি মাসে মূল বেতনের ৪ শতাংশ অর্থ জমা দেয়। কিন্তু এরপরও সেখানে প্রায় ২৪ হাজার আবেদন জমা রয়েছে। যা পরিশোধে এককালীন দুই হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রয়োজন।

জানা যায়, বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই অবসর ও কল্যাণ ভাতার আবেদন অনলাইনে গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে আবেদন জমা দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের আর ঢাকায় আসতে হয় না। কিন্তু এখন কবে টাকা পাবেন সেই খোঁজ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিয়ত শিক্ষকরা এসে ভিড় করেন ব্যানবেইস ভবনে। ফলে বেসরকারি শিক্ষকদের দুর্দশা কোনোভাবেই কমছে না।

অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ সাদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আগে কোনো সরকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কথা ভাবেনি, কোনো বিশেষ বরাদ্দও দেয়নি। ফলে অবসরে যাওয়ার পাঁচ-ছয় বছর পরেও শিক্ষকরা তাদের প্রাপ্য টাকা পেতেন না। তবে এখন প্রতি বছরই বাজেটে কিছু না কিছু টাকা দেওয়া হচ্ছে। তবে যে পরিমাণ শিক্ষক অবসরে যান তাদের পাওনা মেটাতে আমাদের এককালীন বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন। আমরা আগামী বাজেটে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছি। সেটা ডিসভার্স মানি হিসেবে পেলে অনেক শিক্ষকের পাওনা মেটানো সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ডে সিড মানি হিসেবে ৬৬০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। যেই টাকায় হাত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এর লভ্যাংশ অবসর সুবিধার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। আগামী অর্থবছরেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবসর বোর্ডের জন্য বরাদ্দ রেখেছে। তবে এর বেশিরভাগই সিড মানি হিসেবে দেওয়া হবে। ফলে সেই টাকা দিয়ে পাওনা পরিশোধ করা যাবে না।

কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে শিক্ষকদের চাঁদা বাবদ ৪০ থেকে ৪২ কোটি টাকা পাই। তবে আমাদের প্রয়োজন হয় ৫২ থেকে ৫৪ কোটি টাকা। প্রতি বছর ১২০ থেকে ১৩০ কোটি টাকা ঘাটতি থেকে যায়। ফলে অনেক শিক্ষকের আবেদন জমা পড়ে রয়েছে। আমরা আগামী অর্থবছরে কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছি। সেটা পেলে অনেক শিক্ষকের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।’

জানা যায়, সরকার আগামী অর্থবছর থেকে সার্বজনীন পেনশন চালু করছে। তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেহেতু আগে থেকেই পেনশন পান, তাই তারা এর আওতায় আসবেন না। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কিন্তু পেনশন পান না। তারা চাকরি শেষে এককালীন অবসর ও কল্যাণের টাকা পান। এখন শিক্ষকদের জন্যও অবসর বোর্ড ও কল্যাণের মাধ্যমে পূর্ণ পেনশন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল বাশার হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসরকালীন সুবিধার দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। আমার মনে হয়, তারা আন্তরিক নয় বলেই সরকারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক শিক্ষকই অবসরের পর টাকা না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এমনকি ৩০ বছর ধরে নিজের দেওয়া টাকাটাও তাকে যথাসময়ে দেওয়া হয় না। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, এনসিটিবিসহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে অলস হাজার হাজার কোটি টাকা পড়ে রয়েছে। সরকার সেখান থেকেও টাকা এনে শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণের টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নিতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত