নিবন্ধন ব্যয়ের খড়গ আবাসনে

আপডেট : ১১ জুন ২০২৩, ০১:৪০ এএম

অনেকে ভিটেমাটি বিক্রি করে বা শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে সুন্দর পরিবেশে মাথা গোঁজার একটা ঠিকানা প্লট, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কিনে থাকেন। আগামী অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নিবন্ধন খরচ বাড়ানো হয়েছে। ১ জুলাই থেকে প্লট, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট খাতের বেচাকেনায় গেইন কর হার বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। গেইন কর বিবেচনায় শতাংশ হিসাবে পাশাপাশি এলাকাভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। শতাংশ হিসাব বা নির্দিষ্ট পরিমাণের মধ্যে যা বেশি হবে তাই পরিশোধ করতে হবে। এতে খরচ বাড়বে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচায়। পুঁজি সংকটে অনেকে কিনতে পারবেন না, এতে ক্রেতা কমবে। লোকসানে পড়বেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। ধস নেমে আসবে আবাসন খাতে।

আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন (কাজল) দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, কয়েক বছর থেকে নিবন্ধন ব্যয় কমানোর দাবি করে এলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু তা-ই না, আবাসন ব্যবসায়ীরা জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তিতে আবাসন-সংক্রান্ত আরও যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন প্রস্তাবিত বাজেটে তার কোনোটার প্রতিফলন হয়নি। এতে আবাসন শিল্পে সংকট তৈরি হবে।

রিহ্যাব সভাপতি বলেন, আবাসন খাত সম্প্রতি নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। উদীয়মান এই খাতে নানা রকম কর আরোপ ও সরকারের নীতি সহায়তার অভাবে ক্রমে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পতিত হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে জমি নিবন্ধনকালে উৎসে আয়কর ও গেইন কর বাড়ানোয় আবাসন খাতকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এতে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে। বাড়তি দাম ক্রেতার ওপর পড়বে এবং সবার জন্য আবাসন এই স্লোগানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে ও অনেকের আবাসনের স্বপ্নপূরণ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

জানা গেছে, বাজেটে নিবন্ধন ফি বাড়ানোর প্রস্তাব করায় এরই মধ্যে জুলাই থেকে যেসব ফ্ল্যাট, প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রিতে দর-কষাকষি চলছে তার দাম বাড়িয়ে হিসাব কষা হচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বরে বিজয় রাকিন সিটিতে সম্প্রতি ফ্ল্যাট কিনেছেন ব্যবসায়ী রুম্মান ফারাজি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি ও আমার ভাই গ্রামের জায়গা বিক্রি করে এখানে ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করি। আমি চলতি মাসে কিনেছি। আমার ভাই জুলাইতে কিনতে চেয়েছিল। সরকার বাজেটে নিবন্ধন ব্যয় বাড়িয়েছে। আমি যে ফ্ল্যাট কিনেছি সে একই ফ্ল্যাট কিনতে আমার ভাইকে বেশি খরচ করতে হবে। আপাতত ভাইয়ের কাছে বাড়তি টাকা না থাকায় কিনতে পারবে না।

করোনা মহামারীর সময়েই দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে। আবাসন খাত স্থবির হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও ক্রেতার অভাবে অনেক প্লট ও ফ্ল্যাট অবিক্রীত পড়ে থাকে। করোনা কমতে থাকায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে থাকেন।

লোকসানের এ ধারা থেকে বের হয়ে আসতে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অন্তর্ভুক্তিতে এক গুচ্ছ লিখিত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী এবং এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনাকালেও এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বাজেটবিষয়ক প্রস্তাবের মধ্যে নিবন্ধন খরচ কমানোর দাবি ছিল অন্যতম। সরকারি নীতিনির্ধারকরা প্রতিবার আশ^াস দিলেও এখনো এ দাবি কার্যকর করেননি। উল্টো আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিবন্ধন ব্যয় বাড়িয়েছেন।

বিদ্যমান আইনানুসারে বর্তমানে জমির নিবন্ধন ব্যয় ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ। এর মধ্যে গেইন কর ৪ শতাংশ, স্ট্যাম্প ফি ১ দশমিক ৫, নিবন্ধন ফি ১, স্থানীয় সরকার কর ১ দশমিক ৫ ও ভ্যাট ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। রিহ্যাব থেকে ভ্যাট ১ দশমিক ৫ শতাংশ, গেইন কর ২, স্থানীয় সরকার কর ১ শতাংশসহ নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবি করে। প্রতিবেশী অনেক দেশে এ খরচ ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

করবিশেষজ্ঞ এনবিআরের সাবেক সদস্য ড. আমিনুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে গেইন কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। অন্যদিকে শতাংশ হিসাবে গেইন কর নির্ধারণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের পরিমাণও বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে যে পরিমাণ বেশি তা-ই সরকারকে দিতে হবে। এসব খরচ বিক্রেতাকে দেওয়ার কথা থাকলেও আমাদের দেশে ক্রেতার ওপর পড়ে। ফ্ল্যাট, প্লট বা জমির মধ্যে দামের সঙ্গে যোগ হয়ে যায়। সরকার রাজস্ব আদায় বাড়াতে আবাসন খাতে এ উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আবাসন খাতে ক্রেতা হারাতে পারে। কারণ খরচ অনেক বেড়ে যাবে। তাই এ উদ্যোগ নেওয়া সরকারের খুব বেশি লাভ হবে না।

প্রস্তাবিত অর্থবিল এবং রাজস্ব বাজেট-সংক্রান্ত হিসাব বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ১ জুলাই থেকে উৎসে কর যৌক্তিক করা হয়েছে। একই সঙ্গে গেইন কর হার বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। গেইন কর বিবেচনায় শতাংশ হিসাবে পাশাপাশি এলাকাভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। শতাংশ হিসাব বা নির্দিষ্ট পরিমাণের মধ্যে যা বেশি হবে তাই পরিশোধ করতে হবে। ১ জুলাই থেকে প্রতি কাঠা জমির জন্য প্রদেয় করের পরিমাণ মতিঝিল, দিলকুশা, নর্থ সাউথ রোড, মতিঝিল বর্ধিত এলাকা, মহাখালী এলাকায় গেইন কর হিসেবে কেনাবেচার চুক্তি মূল্যের ৮ শতাংশ হারে অথবা ২০ লাখ টাকার মধ্যে যা বেশি তা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। একইভাবে কারওয়ান বাজার এলাকার জন্য ৮ শতাংশ হারে অথবা ১২ লাখ টাকার মধ্যে যা বেশি, আগ্রাবাদ ও চট্টগ্রামের সিডিএ অ্যাভিনিউ এলাকার জন্য ৮ শতাংশ হারে বা ৮ লাখ টাকার মধ্যে যা বেশি, নারায়ণগঞ্জ, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, বাড্ডা, সায়েদাবাদ, পোস্তগোলা এবং গেন্ডারিয়া এলাকার জন্য ৮ শতাংশ হারে বা ৮ লাখ টাকার মধ্যে যা বেশি, উত্তরা, সোনারগাঁও, জনপথ, শাহবাগ, পান্থপথ, বাংলা মোটর, কাকরাইল এলাকার জন্য ৮ শতাংশ হারে বা ১২ লাখ টাকার মধ্যে যা বেশি, নবাবপুর ও ফুলবাড়িয়া এলাকার জন্য ৮ শতাংশ হারে বা ৮ লাখ টাকা মধ্যে যা বেশি সেই পরিমাণ গেইন কর হিসাবে দিতে হবে। রাজউক পূর্বাঞ্চল মডেল আবাসিক টাউন, ঝিলমিল আবাসিক এলাকার জন্য চুক্তি মূল্যের ৮ শতাংশ বা ৩ লাখ টাকার মধ্যে যা বেশি সেই পরিমাণ, রাজধানীর উত্তরা ১ থেকে ৯ নম্বর সেক্টর, ১০০ ফিট রাস্তার পাশে খিলগাঁও এলাকা, আজিমপুর, বিশ^রোডের পাশে রাজারবাগ এলাকা, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, হালিশহর, পাঁচলাইশ, মেহেদিবাগ এলাকার জন্য ৮ শতাংশ বা চুক্তি মূল্যের ৩ লাখ টাকা গেইন কর হিসাবে জমা দিতে হবে। একইভাবে এসব এলাকার বাইরেও দেশের অন্যান্য এলাকার নাম উল্লেখ এবং সীমানা চিহ্নিত করে ভিন্ন ভিন্ন হিসাবে গেইন কর শতাংশের হারে বাড়ানো হয়েছে ও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ধরে দেওয়া হয়েছে। দুটোর মধ্যে যা বেশি হবে তাই পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে হলে এখন থেকে সব এলাকার জন্য প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৮০০ টাকা হিসাবে বা চুক্তি মূল্যের ৮ শতাংশের মধ্যে যা বেশি সেটা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত