অর্থনৈতিক নীতির অভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করা হয়। এটা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক তবে সম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়। বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশে কমছে না। কারণ দুর্বল নীতি এবং ব্যবস্থাপনার অভাব।
গতকাল সোমবার উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস আয়োজিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের চ্যালেঞ্জ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট পিআরআই’র ভাইস চেয়ারম্যান ডক্টর সাদিক আহমেদ। বক্তারা বর্তমান সংকটকালে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় কমিয়ে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো উচিত বলে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।
সাদিক আহমেদ বলেন, ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। যদিও দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি চাপের উৎপত্তি বাহ্যিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা নীতির অভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। যদিও এই সময় অন্যান্য দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উদাহরণ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, যেসব দেশ সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে চাহিদা কমানোর নীতি গ্রহণ করেছে তারা সবাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিলের মধ্যে থাইল্যান্ডের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২ দশমিক ৭ শতাংশে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৪৬ শতাংশ কমেছে। ভারতে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কমার হার ৪০ শতাংশ। ভিয়েতনামের মূল্যস্ফীতি সব সময়ই ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে ছিল।
তিনি বলেন, সরকার আমদানি কমিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপ কমিয়েছে। কিন্তু আমদানি কমায় রিজার্ভের ভারসাম্যে উন্নতি হলেও জিডিপি বৃদ্ধি কম হয়েছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ সাময়িক সুবিধা দিলেও টেকসই সমাধান নয়। উপরন্তু এই ব্যবস্থাগুলো মূলধনে উল্লেখযোগ্য অবনতি রোধ করতে পারেনি কারণ প্রত্যক্ষভাবে বিদেশি বিনিয়োগ প্রসারিত হয়নি, যা বাণিজ্য ঋণের সরবরাহকারী এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক। ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি এবং সেই ঘাটতির জন্য ব্যাংকিং অর্থায়নের ওপর নির্ভর করা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
সাদিক আহমেদ তার মূল প্রবন্ধে বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটকে চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সম্মুখীন হতে হবে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা, রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ, বাজেট ঘাটতির বিচক্ষণ অর্থায়ন, সামাজিক খাতে ব্যয় রক্ষা করা।
তার প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, বিগত বছরগুলোতে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপুল পরিমাণের বিনিয়োগ করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সম্পদ জিডিপির ২০ শতাংশ। এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্পদের বিপরীতে বছরে যদি ১০ শতাংশ হারে রিটার্ন দেয় তাহলে তা জিডিপির ২ শতাংশ হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২০২১-২২ অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্র ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই প্রতি বছর লোকসান গোনে এবং এগুলোর ঘাটতি বাজেট থেকে মেটাতে হয়।
তিনি বলেন, সরকারের রাজস্বের প্রধান উৎস কর। প্রতি বছর সরকার উচ্চাভিলাষী করের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এবং তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে করব্যবস্থা সংস্কার করতে না পারায় রাজস্ব সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য কর পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন জরুরি।
তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিবেশে সরকারকে দেশীয় ঋণের প্রবৃদ্ধি কমাতে হবে। বাজেট ঘাটতির জন্য ব্যাংকঋণ কমাতে হবে। স্বল্পমূল্যের বিদেশি ঋণ এবং বাজারভিত্তিক দেশীয় ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে।
বর্তমান সংকটকালে অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয় কমিয়ে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ভর্তুকি কমানোর পরামর্শ দেন তিনি। ড. সাদিক বলেন, এটা করতে পারলে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি দরিদ্র এবং দুর্বলরা আয়ের উন্নতির মাধ্যমে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সাহায্য করতে পারে। বড় বড় অবকাঠামোতে ব্যয় বৃদ্ধি নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় মনে হলেও সংকটের সময় সাধারণ নাগরিকদের সুবিধা দিতে পারে না।
সভাপতির বক্তব্যে বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, মনে হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রলম্বিত হবে। এটি ২০২৫-২৬ পর্যন্ত চলতে পারে। সামষ্টিক অর্থনীতির এক্সটার্নাল ফ্যাক্টর আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। এখন আমরা কি এক বছরের ফ্রেমওয়ার্ক চিন্তা করব, নাকি তিন বছরের ফ্রেমওয়ার্ক চিন্তা করব। দেশের বর্তমান নেগেটিভ আউটলুকে যে সংকট সেখানে আমরা কী করতে পারি, আমাদের নীতি কী হবে, তা চিন্তা করা উচিত।
তিনি বলেন, আমরা ঋণ আদায় বলি আর কর আদায় বলি আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের বড় দুর্বলতা রয়েছে। এটি কর-জিডিপিতে স্পষ্ট, ব্যাংকবহির্ভূত সম্পদের ক্ষেত্রেও তা সত্য। আশির দশক থেকে শুরু করে ২০০০ সালের দিকে এমন দুর্বলতা কম ছিল। কিন্তু এখন এটি বাড়তে শুরু করেছে। এগুলোতে কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে সরকারকে খুব কড়াকড়ি করতে হবে, চেপে ধরতে হবে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এমন ঝুঁকি সরকার নিতে চাইবে কি না সেটাও দেখার বিষয়।
তার মতে, সরকার এক বছর অভিজ্ঞতার পরও কেন একক বিনিময় হারের দিকে যাচ্ছে না। কেন বাজারভিত্তিক বিনিময় হারে যাচ্ছে না। হয়তো এটি এখন ১১০ আছে, এটি বেড়ে তা হয়তো ১৩০ হবে। কিন্তু সেটিই কি বাঞ্ছনীয় ছিল না? আমাদের রিজার্ভ নেমেই যাচ্ছে, এটা নিয়ে জাতীয়ভাবে কেন বিতর্ক হচ্ছে না। আমরা কভিড থেকে বেরিয়ে এসেছি, এখন অস্বাভাবিক মূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের মূল্যস্ফীতি ভারতের তুলনায় অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে। ভারতের মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমে আসছে, কিন্তু তার সঙ্গে দেশের বাজারে দামের সমন্বয় হচ্ছে না। এটা টেকসই নয়, উচিতও নয়।
