শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আদালতের নথিতে ‘পলাতক’ চাকরি করছেন ভূমি অফিসে

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৩, ০৬:১৪ এএম

চট্টগ্রামে ভূমি অধিগ্রহণের ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। পুলিশ ও আদালতের নথিপত্রে প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে তারা ‘পলাতক’। পলাতক আসামি হিসেবে তাদের নাম-ঠিকানা দিয়ে গত ১ মার্চ একটি গেজেটও প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট আদালত। অথচ তারা সরকারি কর্মস্থলে চাকরি করছেন।

এই তিনজন হলেন দেবতোষ চক্রবর্তী, সুশীল বিকাশ চাকমা ও নুর চৌধুরী। প্রথমজন অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা। দ্বিতীয়জন কানুনগো।

তৃতীয়জন সার্ভেয়ার। এর মধ্যে শেষের দুজন কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায়। দেবতোষ চক্রবর্তী বর্তমানে কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায়। সুশীল বিকাশ চাকমা আছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা ভূমি অফিসে এবং নুর চৌধুরী আছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা ভূমি অফিসে। সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি ভূমি অধিগ্রহণের ১ কোটি ১৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করে দুদক। মামলার আসামি করা হয় চট্টগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সাবেক এবং বর্তমান কর্মকর্তা, কানুনগো, সার্ভেয়ারসহ ১৫ জন। এই ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জন জামিনে আছেন। আলোচ্য তিনজনসহ বাকি পাঁচ আসামি পলাতক আছেন। মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর তৎকালীন সহকারী পরিচালক জাফর আহমদ এ মামলা করেন।

অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তীসহ ছয়জনকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এবং মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ গেজেট হিসেবে গত ১ মার্চ প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে চলতি বছরের ২ এপ্রিল আদালতে আসামিদের হাজির হওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু তারা নির্ধারিত আদালতে হাজির হননি। দুদকের করা মামলার পলাতক আসামি হলেও বর্তমানে চট্টগ্রামের এলএ শাখায় অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন দেবতোষ চক্রবর্তী।

অভিযোগ, দেবতোষ চক্রবর্তী শুধু ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তাই নন। সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে তিনি হয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যও। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২০১৬০৫৪৫০১। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাড়ে চার বছর ধরে তাকে খুঁজে না পেলেও জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ২৪০ নম্বর কক্ষে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে দুদক কর্তৃক মামলা করার পর দেবতোষ চক্রবর্তীকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ‘ম্যানেজ’ করে ফের বদলি হয়ে চলে আসেন চট্টগ্রাম জেলা ভূমি অধিগ্রহণ শাখায়।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়াউদ্দিন বলেন, আইনজীবী সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সমিতির কোনো সদস্য সরকারি বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারবে না। যদি করেন তাহলে গঠনতন্ত্রের ৯ বিধির ১ উপধারা মতে, ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বক্তব্য জানতে অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেবতোষের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে দেবতোষ চক্রবর্তী সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) আবু রায়হান দোলন বলেন, ‘এলএ শাখায় অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দেবতোষ চক্রবর্তী নামে কেউ কর্মরত আছেন কি না আমাকে দেখতে হবে।’

চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার ওসি জাহীদুল কবির বলেন, আদালত কর্তৃক গেজেট প্রকাশ হলেও এই থানায় কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না দেখতে হবে।

জানা গেছে, ১ কোটি ১৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলা করলেও তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ৩১ জুলাই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন দুদক, ঢাকার কর্মকর্তা (উপপরিচালক) আবুল কালাম আজাদ। তিনি আসামিদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এবং মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ ড. বেগম জেবুননেছার আদালত দুদকের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে ১৫ আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেয়।

১ মার্চ প্রকাশিত গেজেট নোটিফিকেশনে বলা হয়, ‘মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হইয়াছে। কিন্তু তাদের না পাওয়ায় জারি করা সম্ভব হয় নাই। যেহেতু ১৯৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ৮৭ ও ৮৮ ধারার বিধান মোতাবেক ওই আসামিদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম গ্রহণ করা হইয়াছে এবং আদালতের বিশ্বাস করিবার কারণ রহিয়াছে যে, এই আদালতের বিচারার্থে উক্ত আসামিগণ গ্রেপ্তার এড়াইবার জন্য পলাতক রহিয়াছে বা আত্মগোপন করিয়াছে।’ দেবতোষ চক্রবর্তীসহ পলাতক থাকা অন্য পাঁচ আসামির গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে নগরের কোতোয়ালি থানার ওসিকে রবিবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জারি করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে ছয় আসামির মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের এলএ শাখার তৎকালীন ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা, বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম-২-এর উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন। তিনি গত ২৮ মে আত্মসমর্পণ করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে জামিনের আবেদন করেন। বিচারক মুনশি আবদুল মজিদ শুনানি শেষে জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। চার দিন পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন।

আদালত সূত্র জানায়, দুদকের করা ওই মামলায় (স্পেশাল ৬১/২০২২) অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তী, কানুনগো সুশীল বিকাশ চাকমা এবং সার্ভেয়ার নুর চৌধুরীসহ পাঁচজন আসামি পলাতক আছেন। মামলায় জামিনে আছেন মিজানুর রহমান মাসুদ, হাফিজুর রহমান, মো. পারভেজ আলম, নুরে কানিজ রীনা, লাকী বেগম, সার্ভেয়ার যথাক্রমে মো. শহীদুল ইসলাম মুরাদ, মো. মজিবর রহমান, মো. আমানাতুল মাওলা, আশীষ চৌধুরী এবং ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত