আফগান আতঙ্ক দূর হলো জয় শান্তর ব্যাটে

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৩, ০৬:০৮ এএম

প্রায় আড়াই বছর পরে টেস্ট খেলতে নামা একটা দলের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেও বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে চাপা আতঙ্ক। কারণ প্রতিপক্ষ যে আফগানিস্তান, যাদের সঙ্গে ২০১৯ সালে টেস্টে প্রথম দেখায় হেরে যাওয়াটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়। প্রায় অজানা প্রতিপক্ষের আতঙ্ক, অচেনা স্পিনারদের নিয়ে ভয় সব কিছুই দূর হলো প্রথম দিনেই। নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরিতে (১৪৬) ও মাহমুদুল হাসান জয়ের হাফসেঞ্চুরিতে (৭৬) প্রথম দিন শেষেই বড় সংগ্রহের পথে বাংলাদেশ। ৭৯ ওভারে রান উঠেছে ৫ উইকেটে ৩৬২ রান। আশা জাগাচ্ছে দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম (৪১*) ও মেহেদি হাসান মিরাজের (৪৩*) ব্যাটও।

টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকে টসটা হারলেন লিটন দাস। আফগান অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শাহিদি নিলেন বোলিং। সকালের শিশির, ঘাসের উইকেট...অনেক সমীকরণই হয়তো ছিল মাথায়। ম্যাচের মাত্র সপ্তম বলে, নিজাত মাসুদ যখন টেস্ট ক্রিকেটে তার প্রথম ডেলিভারিতেই জাকির হাসানের উইকেটটা নিয়ে নিলেন তখন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কঠিন পরীক্ষাই নেবেন আফগান বোলাররা। কিন্তু ওয়ান-ডাউনে নেমে শান্ত স্বচ্ছন্দেই খেলতে লাগলেন পেসারদের, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের উত্তাপে উইকেটের আর্দ্রতাও উধাও। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আফগান বোলারদের এলোমেলো বোলিং, একের পর এক নো-বল। ফলে প্রথম ঘণ্টার পরই স্পিনারদের শরণ নিতে হয়েছে আফগান অধিনায়ককে।

গরমের জন্য ঢাকা টেস্টে নিয়মিত পানি পানের বিরতির চেয়ে একটু বেশিই বিরতি দেওয়া হবে, এমনটা আগেই জানিয়েছিলেন বিসিবির ক্রিকেট অপারেশনস বিভাগের চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস। ঘন ঘন পানি পানের বিরতির সঙ্গে দিনভর ১৫টা নো-বল আর ৭টা ওয়াইডের সঙ্গে ৪ বার রিভিউ, পেসাররা মাত্র ৩০ ওভার বল করলেও গোটা দিনে আধঘণ্টা সময় বাড়িয়েও শেষ করা যায়নি কোটার ৯০ ওভার। ঘাটতি রয়ে গেছে ১১ ওভারের। এই ৭৯ ওভারেই সাড়ে চারের ওপর রানরেটে রান তুলেছে স্বাগতিকরা।  যা টেস্টে প্রথম দিনের খেলায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্টে প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩৭৪/৪। সেদিন অবশ্য খেলা হয়েছিল পুরো ৯০ ওভার। ১১ ওভার খেলা হলে হয়তো সেই সংগ্রহকে ছাড়িয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ। ৩৬২, মিরপুরে প্রথম দিনে সর্বোচ্চ সংগ্রহ।

কাল আফগানদের বিপক্ষে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে শান্ত-জয় যোগ করেছেন ২১২ রান। ৯ বছরেরও বেশি সময় পর দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ২০০র বেশি রান পেল বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শামসুর রহমান ও ইমরুল কায়েস দুজনেই শতরান করে দ্বিতীয় উইকেটে যোগ করেছিলেন ২৩২ রান। আফগানদের বিপক্ষে শান্ত শতরান করলেও জয় আটকে গেছেন তিন অঙ্কের আগেই।

শান্ত সব সমালোচনার জবাব দিচ্ছেন রানের ভাষায়। যাকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে নেওয়াকে কেন্দ্র করে ছিল অনেক বিতর্ক, সেই শান্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছিলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। এরপর বিপিএল, চেমসফোর্ডে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ...শান্ত রান করেছেন সবখানেই। আইরিশদের বিপক্ষে দেশে টেস্টে ভালো করতে না পারলেও আফগানদের বিপক্ষে ঠিকই হেসেছে শান্তর ব্যাট। টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় শত রানের দেখা পেয়েছেন এই বামহাতি, দেশের মাটিতে টেস্টে তার প্রথম শত রান। আগের দুটো ছিল পাল্লেকেল্লে আর হারারেতে।

গরম আর ক্লান্তির কাছে হার মেনে একটু অধৈর্যই হয়ে পড়েছিলেন শান্ত। নো-বলে বোল্ড হয়ে জীবন পেয়েও শতরানের পর দ্রুত রান তুলতেই ছিলেন আগ্রহী, হামজা হোটাকের নিরীহ বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে উড়িয়ে মেরেছিলেন। ঠিকঠাক ব্যাটে বলে না হওয়াতে বাউন্ডারি লাইনে দিয়েছেন সহজ ক্যাচ। ১৪৬ রানে আউট হয়েছেন শান্ত। অন্যদিকে জয়ও অকেশনাল স্পিনার রহমত শাহের প্রথম টেস্ট শিকার হয়ে ফিরেছেন ৭৬ রানে, অফস্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিতে গিয়ে স্লিপে দিয়েছেন ক্যাচ।

মমিনুল হকের আড়ষ্টতা কাটেনি, কোনো রান না করেই আউট হওয়া থেকে রিভিউতে বাঁচলেও ১৫ রান করে রিভিউতেই নিয়েছেন বিদায়। লেগস্টাম্পের বাইরে দিয়ে বের হয়ে যাওয়া বলে ব্যাটের আলতো পরশ ছিল, মাঠের আম্পায়ার না শুনলেও যন্ত্রের কান শুনেছে ঠিকই। অধিনায়ক লিটন দাসও জহির খানের গুগলি ধরতে না পেরে সিøপে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নিয়েছেন মাত্র ৯ রান করে।

১ উইকেটে ২১৮ থেকে ৫ উইকেটে ২৯০, দ্রুত ৪ উইকেট পতনের পর ভরসা সেই আদি অকৃত্তিম মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে। সঙ্গে যোগ দিয়েছেন এ সময়ে ক্রমেই বোলার পরিচয় ছাপিয়ে অলরাউন্ডার হয়ে ওঠা মিরাজ। মুশফিকের অপরাজিত ৪১ আর মিরাজের অপরাজিত ৪৩ রানের ইনিংসে আর কোনো বিপদ না ঘটিয়ে দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ।

কাল দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হয়ে আসা শান্ত বলে গেলেন, আজ মুশফিক ও মিরাজ যতটা বেশি সময় সম্ভব ব্যাট করে যাবেন এটাই দলের চাওয়া, ‘এখন মুশফিক ভাই আর মিরাজ যেভাবে ব্যাট করছে এই জুটিটা বড় হলে মাঝের যে দুই-একটা উইকেট গিয়েছে তাহলে সেটা কাটিয়ে ওঠা যাবে।’

প্রথম ইনিংসে অন্তত পাঁচশ রানের কাছাকাছি করার লক্ষ্যই থাকবে বাংলাদেশের, তারপর দিনশেষে আফগানদের যতটা বেশি উইকেট তুলে নেওয়া।

দিনের সপ্তম বলে উইকেট হারালেও প্রথম দিনটা বাংলাদেশেরই। তবে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে অন্যপ্রান্তে লিটন থাকলে হয়তো পূর্ণতা পেত দিনটি। আর আক্ষেপ হয়ে থেকে গেল জয়ের শত রান হাতছাড়া করা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত