ত্রিশক্তির অঙ্কে নির্বাচনী রাজনীতি

মার্কিন অবস্থান স্পষ্ট উদ্দেশ্য অস্পষ্ট

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩, ০৫:১৩ এএম

বাংলাদেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন, মানবাধিকার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এসব বিষয়ে তাদের প্রত্যাশার কথা সরকারকে জানিয়েছে। তার অবস্থানের পক্ষে জাপানও। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ইস্যুতে রাশিয়া ও চীনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীত।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান এ দেশের জনগণ ও রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে। সেটি সম্ভব না হলে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বিপদের জালে জড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সর্বশেষ গত ২৪ মে নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দিলে দায়ী ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে যোগ করেছে সভা-সমাবেশ, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকে।

এর এক দিন পরই ২৫ মে কংগ্রেসের ৬ সদস্য স্কট পেরি, ব্যারি মুর, ওয়ারেন ডেভিডসন, বব গুড, টিম বার্চেট এবং কিথ সেলফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে চিঠি দেন। তারা বাংলাদেশের সরকার কর্র্তৃক ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ ঘটনা বন্ধে এবং ‘বাংলাদেশের জনগণকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সর্বোত্তম সুযোগ করে দিতে’ জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৬ সদস্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলকে গত ১২ জুন চিঠি দেন। এখানেও বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ, চলমান সংকটের টেকসই ও গণতান্ত্রিক সমাধানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের আলোচনার কথা বলা হয়েছে। চিঠিদাতারা হলেন ইভান স্টিফেনেক (সেøাভাকিয়া), মিকেইলা সিজদ্রোভা (চেক প্রজাতন্ত্র), অ্যান্দ্রে কোভাচভ (বুলগেরিয়া), কারেন মেলচিয়র (ডেনমার্ক), হ্যাভিয়ের নারত (স্পেন) ও হেইডি হাউতালা (ফিনল্যান্ড)।

দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের কাছে গত ৮ জুন চিঠি লিখেছেন দেশটির ছয়জন কংগ্রেস সদস্য উইলিয়াম আর কিটিং, জেমস পি ম্যাকগভার্ন, বারবারা লি, জিম কস্টা, ডিনা টাইটাস ও জেমি রাসকিন চিঠি দিয়ে আবারও জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে যাতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য। কংগ্রেস সদস্য উইলিয়াম আর কিটিং গত মঙ্গলবার এক টুইট বার্তায় এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এর আগে গত নভেম্বরে ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আয়োজন করতে বলেছেন।

এ ঘটনার মধ্যেই গত বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায়, অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতি সমুন্নত রাখতে এবং নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই একটি উন্নয়নের পথ অনুসরণের প্রশ্নে বাংলাদেশকে আমরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি।

আরেক পরাশক্তি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ম্যান্টিটস্কি গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, রাশিয়া বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে চায় না। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সম্পর্কিত মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি ও নিষেধাজ্ঞা দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনীতির একটি কৌশলের অংশ। চীন যেভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বলয় বিস্তারে সক্ষম হয়েছে, সেখানে এই অঞ্চলে ভারত ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরাষ্ট্র নেই। ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্ব মোড়লদের এমন মন্তব্য দেশগুলো নিজেদের স্বার্থই করছেন।

তাদের মতে, বাংলাদেশকে একটি পক্ষ বেছে নিতে হচ্ছে। ফলে যে পক্ষেই যাবে তার বিপরীত পক্ষ থেকে পাওয়া সুযোগ-সুবিধায় ছেদ পড়বে। জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ অনেক বড় বাজার। এই বাজারে ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনেক। সম্প্রতি ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বিশাল জলসীমা পেয়েছে, সেখানেও প্রচুর সম্পদ থাকার কথা। ফলে নানা কারণে বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই শক্তিধরদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পৃক্ততাও রয়েছে।

আবার যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের একটি বড় বাজার। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে এবং একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কভিডের টিকা সরবরাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সাহায্য করেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে প্রশংসা করেই যুক্তরাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করেনি, সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে জাপান প্রথমসারিতে।

বাংলাদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নও সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের পথই অনুসরণ করে। প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক খাতে রপ্তানি কমে গেলে বাংলাদেশ একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

এর মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার জেনেভায় প্যালেস ডি নেশনসের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, শিগগিরই ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করতে পারে বাংলাদেশ। ব্রিকসে বর্তমানে পাঁচ সদস্য হলো ব্রাজিল, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও রাশিয়া। এ দেশগুলো নিয়ে গঠিত ব্রিকসকে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-সেভেনের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়।

জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটা ভূরাজনৈতিক সমস্যায় পড়ে গেছি। আমাদের রাজনীতিবিদরা নিজেদের সমস্যা যদি নিজেরা সমাধান করতে না পারেন তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘একটা সময় পশ্চিমা বলতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ছিল। কিন্তু এখন বহুমাত্রিক হয়ে গেছে। এখন সবাই নিজ স্বার্থ দেখে। যেমন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে চীনের বিনিয়োগ আছে। এখন তারা যদি দেখে গণতন্ত্রের নামে অন্য কোনো দেশ ওই দেশের স্বার্থ উদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটাকে তারা সহজভাবে নেবে না। যার ফলে এখন আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাচ্ছি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বলয় হয়ে গেছে। যদিও ভারত এখনো পুরোপুরি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি, ডেভেলপমেন্ট কাঠামোতে বিনিয়োগ বা অন্য কোনো বিষয় সামনে আনতে চাচ্ছে। যে কারণে তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ অনেক ত্যাগ স্বীকার করে এতদূর এসেছে। এটা ভুলে গেল চলবে না, একটা দেশ তার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কারণে রীতিমতো জেনোসাইডের স্বীকার হয়েছে, প্রচণ্ড স্যাক্রিফাইস করেছে, প্রচুর ছাত্র ও মানুষ মারা গেছে। সে রকম একটা দেশ ছয়জন বিদেশি চিঠি দিয়ে কিছু বলবে আর বাংলাদেশের রাজনীতি ঠিক হয়ে যাবে, এটা সম্ভব না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত