বাবা আমার বন্ধু

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৩, ১২:৫০ এএম

কে বলে বাবা তাদের সন্তানের কাছের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন না। জেনারেশন গ্যাপ থাকলেও বয়স কি কখনো বন্ধুত্বের অন্তরায় হতে পারে। জগতের সব সফল সম্পর্কের ভিত হলো বন্ধুত্ব। সেই তালিকা থেকে বাদ পড়বে না বাবা ও সন্তানের সম্পর্কও। আসছে ১৮ জুন বাবা দিবস উপলক্ষে বাবা-ছেলের বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিত  লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালে, তার সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিলে মানুষ করা কিন্তু সহজ হয়ে ওঠে। একটা সময় বাবা শুধু সন্তানের অভিভাবক ও প্রতিপালক ছিলেন। কিন্তু এখন যুগ বদলে গেছে। সন্তানকে মানুষ করতে হলে তাদেরই একজন হয়ে উঠতে হবে বাবা। সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠলে খুব সহজেই তার বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন। তাকে মানুষ করাও সহজ হবে। কিন্তু একজন বাচ্চার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো সহজ কাজ নয়। কারণ বেশির ভাগ টিনএজরা বড়দের খুব ভরসা করতে পারেন না। তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তাদের মতো করেই ভাবতে হবে।

অভিভাবক ব্যাংকার জুলফিকার রাজ্জাক বলেন, আমার ছেলে এবার কলেজে ভর্তি হলো। আমি যেহেতু কর্মজীবী সেহেতু খুব বেশি সময় দিতে পারি না। তাই সপ্তাহে ছুটির দিনটা রাখি ওর জন্য। একসঙ্গে কখনো ঘুরতে যাই, বাজারে যাই। ওর মতামতকে যেমন গুরুত্ব দেই, তেমনি ভালোমন্দও বোঝাতে চেষ্টা করি। আমার ভালোমন্দও ওর সঙ্গে শেয়ার করি। আমি মনে করি, প্রত্যেক বাবারই উচিত সন্তানের সঙ্গে কোয়ালিটিফুল সময় কাটানো।

এমন আছে ব্যক্তিগত কাজ, ব্যস্ততা আর উদাসীনতার কারণে সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দেন না অনেক অভিভাবক। আবার অনেক অভিভাবক বুঝতেই পারেন না তাদের আলাদা করে সময় দেওয়া দরকার। অথচ সংবেদনশীল বয়সেই সন্তানের প্রয়োজন হয় আদর, ভালোবাসা আর পরামর্শের। পরিবার থেকে সেই গাইডলাইন না পেলে বিপথগামী হতে পারে আদরের সন্তান। অভিভাবকের করণীয় জানা জরুরি।

সন্তানকে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে দেখা উচিত। আমরা ভুলে যাই যে, প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বাচ্চাদেরও নিজস্ব অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দ ও মতামত রয়েছে। সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে তারা যে একেকটা খুদে মানুষ তা আমরা মনে রাখি না। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোর প্রথম শর্ত হলো, সে যে স্বতন্ত্র মানুষ সেটা স্বীকার হরে নেওয়া। বয়স অভিজ্ঞতায় সে আপনার সমকক্ষ নয়, কিন্তু তাই বলে তাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। বাবা-মায়ের বাচ্চাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জমাতে ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হলো বাচ্চাদের নানা বিষয়ে তাচ্ছিল্য করা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিদ ছাত্রকল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের ইফরাত জাহান জানালেন, এখানে অভিভাবকরা একটা বড় ধরনের ভুল করেন। স্কুলে থাকতে বলেন, কলেজে উঠ, তারপর স্বাধীনভাবে চলতে পারবা। আবার কলেজে পড়ার সময় বলেন, ভার্সিটিতে উঠলে নিজের মনমতো চলতে পারবা, তার আগে আমাদের কথা মেনে চলো। ফলে যেটা হয়, শিক্ষার্থীরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের মনমতো চলতে চায় এবং হঠাৎ স্বাধীনতা পেয়ে ভুল করে বসে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের যেটা করতে হবে সেটা হলো সন্তানকে বলতে হবে মাস্টার্স শেষ করার পর তুমি নিজের সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে পারবা। তার আগে আমাদের পরামর্শ শুনতে হবে। তবে অবশ্যই সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে, সব কথা যেন সে অভিভাবকের সঙ্গে শেয়ার করে। স্কুলে থাকতে সন্তানকে যেভাবে দেখাশোনা করা হয়েছে কলেজে ওঠার পরও একইভাবে তার প্রতি নজর রাখতে হবে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে। কারণ, এ বয়সে সে হয়তো ইতিমধ্যে শারীরিকভাবে এডাল্ট, কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক যোগ্যতা তার এখনো হয়নি। ফলে তাকে তার নিজের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বন্ধুত্বের প্রধান ভিত্তি হলো একে অপরকে নির্ভয়ে সব কথা শেয়ার করা। সন্তান যেন আপনাকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে ভাবতে পারে। আপনার সঙ্গে নির্দ্বিধায় যেন সব কথা শেয়ার করতে পারে। ওর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কোনো পক্ষপাত ছাড়াই। বাচ্চারা ভাবে, তাদের অভিভাবকরা তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে না। এবং কারণ ছাড়াই দোষারোপ করে। বাচ্চারা যদি কোনো ভুল করে দোষ আপনার কাছে স্বীকার করে তবে তাকে বকা না দিয়ে নরমভাবে ভুলটা শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। সন্তান যেন বিশ্বাস করার সিদ্ধান্তটি নিয়ে কখনো আক্ষেপ না করে।

সন্তানকে ভরসা করা বাবার কর্তব্য। সন্তানকে কোনো বিষয়ে তিরস্কার করার আগে ভেবে দেখুন। এ বিষয়ে আপনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে তো। যে উপদেশ দিতে চাইছেন সেটি আপনার রোজকার জীবনে আদৌ মেনে চলেন কিনা। বাচ্চারা আপনাকে দেখে কিন্তু শেখে। কোনো দ্বিচারিতা পছন্দ করে না। যদি বুঝতে পারে আপনার ডাবল স্ট্যান্ড। তাহলে আপনার ওপর ভরসা হারাতে দ্বিধা করবে না।

সন্তানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সব থেকে ভালো উপায় হলো তার ভালো কাজকে উৎসাহ দেওয়া। খারাপ সময়ে আস্থা নিয়ে পাশে থাকা। ওর প্রচেষ্টা বা উদ্যমকে সবসময় যথাযথ সম্মান জানানোর চেষ্টা করুন। প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই সন্তানের কাজ বা প্রচেষ্টার খামতিগুলোকে ধরিয়ে দিতে হবে। চেষ্টা করুন সবসময় ওর পাশে থাকতে। একবার বিশ^াসী বন্ধু হয়ে উঠলে দেখবেন সন্তান মানুষ করা আপনার কাছে পানির মতো সহজ। মা-বাবা দুজনই যখন চাকরি, ব্যবসা কিংবা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, সন্তান তখন অনেকটা অভিভাবকহীনের মতোই। যেটুকু সময় পায়, তা সন্তানের আদর, আহ্লাদ কিংবা আবদারের জন্য যথেষ্ট নয়। এ ধরনের পরিবারের সন্তানরা গম্ভীর, রাগী আর বদমেজাজি হয়ে থাকে। একা থাকার কারণে অনেক সময় হীনম্মন্যতায় ভোগে। এমনকি বিপথগামী হয়।

সমসাময়িক নানা ঘটনার কারণে অনেকেই সন্তানকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হয়। প্রথমে বোঝা দরকার ওর যে পরিবর্তন হচ্ছে সেটা নেগেটিভ কি না। যদি বুঝতে পারেন, ধীরে ধীরে তার পা পিছলে যাচ্ছে, তাহলে তার পেছনে নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রথমে তাকে উদাহরণ দিয়ে বোঝান। বলুন, আমরা চাই না তোমার দ্বারা এমন কিছু ঘটুক, যা তোমার, আমাদের ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এতে করে যতই ব্রেনওয়াশ করা হোক না কেন, যখন সে বুঝবে মা-বাবা এটা সমর্থন করছেন না। তখন দোটানায় পড়ে যাবে। যদি দেখেন আপনার কথা আমলে নিচ্ছে না, তাহলে ওর বন্ধুদের মাধ্যমে বোঝাতে পারেন, কারণ আপনার চেয়ে বন্ধুদের কাছে ও অনেক বেশি সহজ হতে পারে। বন্ধুদের কথায়ও কোনো কাজ না হলে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং মনরোগবিদ্যা বিভাগীয় প্রধান ডা. ফারুখ হোসাইন জানালেন, আমাদের এখানে দেখা যায় কেবল পড়াশোনায় অমনোযোগী হলে, পরীক্ষায় কম নম্বর পেলেই মা-বাবা উদ্বিগ্ন হন। তারা মনে করেন সন্তান পড়াশোনা ঠিকমতো করছে না। আমাদের কাছে সেবা নিতে আসা এমন অনেক অভিভাবকই পেয়েছি। পরে সুলুকসন্ধান করে দেখা গেছে, পড়াশোনায় খারাপ করাটা আসলে রোগ নয়। এটা উপসর্গ মাত্র। পরিবারে একাকিত্ব বোধ করলেই সে ধীরে ধীরে বাইরে সঙ্গ খুঁজবে। তার মনে এক ধরনের হতাশা জন্ম নেবে, যার প্রভাব পড়ে তার পড়ালেখায়। অনেকে সন্তানের শুধু নেতিবাচক দিকগুলো নিয়েই আলোচনা করেন। এটাও বাদ দিন। ভালো কিছুর জন্য পুরস্কৃত করুন, উৎসাহ দিন। সন্তান যদি বুঝতে পারে যে, মা-বাবা তার পাশে আছে তাহলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে।  কিশোর সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, আপনি কি চান আপনার কিশোর সন্তান আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোক এবং সেই শ্রদ্ধা হোক ভালোবাসার? তবে তাদের নিজে সম্মান করে এই বিষয়টি তাদের শেখান। শুধু ভয়, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, সব শখ পূরণের ব্যবস্থা কখনো সম্মান এনে দিতে পারে না। সন্তানের ব্যক্তিত্ব, ধারণা, মতামত এবং আবেগ অনুভব করুন এবং সম্মান দিন। তাদের বন্ধুদের সামনে বা এমনকি তাদের অগোচরে তাদের নিন্দা করবেন না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তাদের মতামতকে তুচ্ছ বা সমালোচনা করবেন না। যখন আপনি আপনার সন্তানদের অসম্মান করে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন না, তারাও আপনার প্রতি একই প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত