ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন

পরিচালকদের মেয়াদ ১২ বছর জাপার ওয়াকআউট

আপডেট : ২২ জুন ২০২৩, ০২:৩০ এএম

পরিচালক পদে টানা ১২ বছর থাকার বিধান যুক্ত করে ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০২৩’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিলে খেলাপি ঋণগ্রহীতার ঋণ সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে এসব সংশোধনী সংসদে তোলা বিলে বা স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে ছিল না। ব্যাংকের পরিচালক পদের মেয়াদ ৯ বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করে বিল পাসের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্যরা (এমপি)।

গতকাল বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পরিচালক পদের মেয়াদ বাড়ানোর সংশোধনী প্রস্তাবটি যেভাবে আনা হয়েছে তা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান বিরোধী দল জাপার এমপিরা। তারা বলেন, ব্যাংক লুটপাটের মূল হোতা পরিচালকরা। তাদের সুবিধা দেওয়ার জন্য আইন সংশোধন করা হচ্ছে। তার চেয়ে পরিচালকদের মেয়াদ আজীবন করে দেওয়া হোক। বিলের ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন জাপা ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। তবে তাদের সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

গত ৮ জুন ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০২৩ সংসদে তুলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। সংশোধনীর মূল প্রস্তাবে পরিচালক পদের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি ছিল না। ওইদিন বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। স্থায়ী কমিটিও পরিচালক পদের মেয়াদ নিয়ে কোনো সংশোধনী আনেনি।

গতকাল সংসদে বিলটি পাসের আগে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সরকারদলীয় এমপি আহসানুল ইসলাম টিটু পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানো ও খেলাপি ঋণগ্রহীতার ঋণ সুবিধাবিষয়ক সংশোধনী দুটি প্রস্তাব করেন। টিটুর পরিচালক পদের সংশোধনী প্রস্তাবটি দেখে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান জাপার কয়েকজন এমপি। আলোচনায় অংশ নিয়ে এভাবে বিলে সংশোধনী আনা যায় কি না, তারা এ প্রশ্ন তোলেন এবং এ বিষয়ে স্পিকারের ব্যাখ্যা দাবি করেন।

জাপার সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, পরিচালক পদের মেয়াদ ১২ বছর করার জন্য সরকারি দলের একজন সদস্য সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছেন। এটা বিল উত্থাপনের সময় ছিল না। যেহেতু সরকারি দলের সংসদ সদস্য এ প্রস্তাব দিয়েছেন, তাই মনে হচ্ছে এটা গ্রহণ করা হবে। যে বিষয়টি সংসদে উত্থাপনই হয়নি সেটা চাওয়া হয় কী করে? ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্ত করতে হবে।

জাপার আরেক সদস্য মুজিবুল হক বলেন, পরিচালকরা হচ্ছেন ব্যাংক লুটপাটের মূল হোতা। কোনো পরিচালক সুপারিশ না করলে আমার মতো লোক গেলেও ব্যাংক ঋণ মিলবে না। যে আইনের কোনো ধারা অর্থমন্ত্রী সংশোধনীতে আনেননি, যে সেকশন সংশোধনের জন্য সংশোধনী কমিটি কোনো সুপারিশ করেনি, সেখানে একজন সরকারি দলের সদস্য কোন আইনে এ সংশোধনী আনলেন? তিনি এটা পারেন কি না, এটা জানা খুবই দরকার। অভিভাবক হিসেবে স্পিকার এটা বলবেন বলে আশা করি।

তিনি আরও বলেন, মনে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে কনভিন্স করে সরকারি দল করেন এমন অনেক ব্যাংকের পরিচালকদের সুপারিশে এটা আনা হয়েছে, পাস করার জন্য। সেটা হলে আমরা আমাদের সব সংশোধনী প্রত্যাহার করলাম। কারণ এর থেকে বড় অন্যায় আর হতে পারে না। যেখানে ব্যাংক লুটপাট করা হচ্ছে। বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক বসে বসে তামাক খায়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালক হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে চলে যায়। আপনারা দেখছেন না। আপনারা আছেন কাউকে ফেভার করার জন্য। পরিচালকের মেয়াদ ১২ বছর করার এ প্রস্তাবে আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

জাপার এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘ব্যাংক মালিকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য আইনটি আনা হয়েছে। তারা জনগণের টাকা অপব্যবহার করে। সর্দি-কাশি হলেই তারা ব্যাংকের টাকায় সিঙ্গাপুর চলে যান।’ স্বতন্ত্র পরিচালক কারা এ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমরা তার লিস্ট চাই। আমরা এ ভাগ্যবানদের সংসদে দেখতে চাই। সব দলীয় কর্মী ও আত্মীয়স্বজনকে স্বতন্ত্র পরিচালক করা হয়। তারা ব্যাংকে যায় শুধু লোন দেওয়ার জন্য। এখানে হরিলুট চলছে। আমরা কমানোর প্রস্তাব করছি না। তাদের মেয়াদ আজীবন করে দেন। আমি এখন প্রস্তাব আনলাম। এ পরিচালকরা আজীবন থাকবে। আল্লাহ যতদিন হায়াত রাখছেন, আপনারা খাইতে থাকেন। আমরা দেখতে থাকি।’

জাপার সদস্য পীর ফজলুর রহমান বলেন, ‘সরকার তাদের প্রিয় পরিচালকদের কীভাবে পদে রাখবেন সেটা ভুলে গিয়েছিলেন। এ কারণে পরবর্তীকালে এ সংশোধনী আনা হয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় আইনে সংশোধনী আনা হচ্ছে তা সঠিক প্রক্রিয়া নয়।’

বিরোধী দলের এমপিদের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ ১৪ বছরে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। সরকারি ব্যাংকের শাখা দ্বিগুণ বেড়েছে। ব্যাংকের আমানত সাতগুণ বেড়েছে। বছরওয়ারি মুনাফা বেড়েছে আটগুণ। তিনি আশা করেন, তার এ বক্তব্যে ভুল বোঝাবুঝির কিছুটা অবসান হবে।

সরকারি দলের এমপি আহসানুল ইসলাম তার সংশোধনী প্রস্তাব তুলতে গেলে বিরোধী দলের এমপিরা হইচই করেন। তখন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, আগে সংসদ সদস্যকে সংশোধনী প্রস্তাব তুলতে দেন। এরপর বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।

আহসানুল ইসলাম সংশোধনী প্রস্তাব তোলার পর স্পিকার এ বিষয়ে রুলিং দেন। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির সংশ্লিষ্ট বিধি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল সংশোধনীতে বিলের ১০ দফায় সংশোধনীর প্রস্তাব ছিল। আর আহসানুল ইসলাম যে সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন, সেটিও এই দফার একটি উপদফা। এখানে বিলে কোনো নতুন ধারা যুক্ত করা হয়নি বা এমন কোনো নতুন দফাও যুক্ত করা হয়নি। এটি অপ্রাসঙ্গিক নয়।

স্পিকারের বক্তব্যের পর জাপার সদস্য ফখরুল ইমাম কথা বলতে চাইলে তিনি মাইক না দিয়ে বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য এটা আমার রুলিং। এ বিষয়ে আর আপনার কিছু বলার নেই।’ ফখরুল ইমাম এ সময়ে আবারও হাত তুললে জবাবে স্পিকার বলেন, ‘আপনাকে সুযোগ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। আমি দিয়েছি আমার ব্যাখ্যা।’

এরপর স্পিকার অর্থমন্ত্রীকে ফ্লোর দেন। এ সময় মাইক ছাড়াই বিরোধী দলের সদস্য চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকেন। পরে স্পিকার অর্থমন্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের বলেন, ‘আমরা বিধির বাইরে কিছু করব না।’ তবে বিরোধী দলের এমপিরা হইচই করতে থাকেন। ফ্লোর নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি আহসানুল ইসলামের সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করছেন। এটি বলার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের এমপিরা প্রবল হইচই শুরু করেন। মাইক ছাড়াই কথা বলতে থাকেন মুজিবুল হক। তার পাশাপাশি কাজী ফিরোজ রশীদও দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ফিরোজ রশীদকে মাইক দেওয়া হয়। তিনি অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমরা যে আজীবনের কথা বললাম, আপনি কি সেটা গ্রহণ করলেন? এই একজন পরিচালক আমৃত্যু থাকবে। সেটা গ্রহণ করছেন, না ১২ বছর করছেন? কোনটা সেটা আমাদের স্পষ্ট বলতে হবে।’ মুজিবুল হকও একই ধরনের বক্তব্য দেন। এ সময় বিরোধী দলের এমপিরা হইচই করতে থাকেন। কিছু সময়ের জন্য সংসদে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

পরে স্পিকার অর্থমন্ত্রীকে আবারও মাইক দেন। তবে তিনি কথা বলেননি। এ পর্যায়ে স্পিকার সংশোধনী ভোটে দেন। দফাভিত্তিক সব সংশোধনী ভোটে দেওয়া হয়। এ সময় জাপার এমপিরা ওয়াকআউট করে সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। বিলটি পাসের পর তারা আবারও অধিবেশনে ফিরে আসেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত