আসাম-মেঘালয়ে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাসে দেশে বন্যার শঙ্কা

আপডেট : ২৩ জুন ২০২৩, ০২:২৭ এএম

কয়েক দিন ধরেই ভারতের আসাম, মেঘালয়সহ বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি রাজ্যে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। অবিশ্রান্ত বৃষ্টির জেরে ফুঁসছে আসামের ব্রহ্মপুত্র নদ। তার একাধিক শাখানদী দুই কূল ছাপিয়ে বইছে। ইতিমধ্যে আসামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে রাজ্যটিতে। ওই বন্যার পানি গড়িয়েছে বাংলাদেশেও। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তাসহ উত্তরের অনেক নদী অববাহিকায়ও দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। গত কয়েক দিন ধরে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জসহ ওইসব নদ-নদীগুলোর পাড় ভাঙনও দেখা দিয়েছে। মেঘালয়ের পানি নেমে বন্যাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সিলেট-সুনামগঞ্জেও। এর মধ্যেই ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) দেশটির ১০টি রাজ্যে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে নতুন করে। আইএমডির তথ্য বলছে, ওই তালিকায় আছে ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, পশ্চিমবঙ্গও। ভারতের ওইসব রাজ্যে অতিরিক্ত পানি দেশে প্রবেশ করে কয়েক দিনের বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, চলতি সপ্তাহে উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সিলেট-সুনামগঞ্জ) এবং জুনের শেষে উত্তরাঞ্চলে বন্যা তীব্র হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, টানা বৃষ্টিতে সীমান্তের ওপারে ভারতের আসাম রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় কুড়িগ্রামে ধরলা ও গাইবান্ধার ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। তবে তিস্তার পানি এখনো স্থিতিশীল থাকলেও শুক্রবার নাগাদ পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা অববাহিকা ফুলেফেঁপে উঠলেও পদ্মা অববাহিকা এখনো শান্ত।

তিনি বলেন, ১৮ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত তাপপ্রবাহ থাকলেও সিলেট-সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। অতিভারী বৃষ্টিতে এরই মধ্যে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বইছে বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপরে। আবার উজানে মেঘালয়, আসামে ঢলে বাড়ছে সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, সারিগোয়াইন, বালুখালী, কংশ ও সোমেশ্বরীর পানি।

কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চলে দুর্ভোগ : কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ বিভিন্ন কাঁচা-পাকা রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা বিঘিœত হয়ে পড়েছে। লোকজন হেঁটে ও নৌকায় চলাচল করছে। কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের জালালের মোড় থেকে উলিপুর উপজেলার মোল্লারহাট যাওয়ার একমাত্র সড়কটির পাঁচ-ছয়টি অংশে পানি ওঠায় সড়কপথে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষজন হাঁটুপানি ভেঙে এবং নৌকায় গন্তব্যে যাতায়াত করছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে এ সড়কটিরও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় লোকজন।

গতকাল কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে, বেলা ৩টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার, ধরলা নদীর পানি সদর পয়েন্টে বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ও দুধকুমার নদীর পানি জেলার ভুরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ২৪ জুন পর্যন্ত প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই।

জামালপুরে পানি বাড়ছে : জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী উপজেলায় যমুনা এবং সদর উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক আবদুল মান্নান জানান, জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এখনো কোনো এলাকা প্লাবিত হয়নি। বড় ধরনের বন্যার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে মাঝারি ধরনের বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঝিনাই নদীতে ভাঙন : টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে পানি বৃদ্ধির সঙঙ্গ সঙ্গে ঝিনাই নদীতে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক বাড়ি এ ভাঙনের কবলে পড়েছে। এ ছাড়া কুর্নি-ফতেপুর পাকা সড়কটি ভেঙে উপজেলা সদরের সঙ্গে ওই এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফতেপুর ইউপ চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন, নদীভাঙনের খবর পেয়ে আমি আমাদের এমপি খান আহমেদ শুভর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাত হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভাঙনের বিষয়টি জেনেছেন বলে জানান। ভাঙনকবলিত এলাকা চিহ্নিত করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

শাহজাদপুরে যমুনায় বিলীন ২৫ বাড়িঘর : গতকাল বৃহস্পতিবারও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার খুকনি ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগ্রাম, আরকান্দি, জালালপুর ইউনিয়নপাড়া, মোহনপুর, পাকুরতলা রূপসী, সৈয়দপুর, কৈজুরী ইউনিয়নের গোপালপুর, চরকৈজুরী, পোরজনা ইউনিয়নের উল্টাডাব ও রানীকোলা গ্রামের নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের নেপিয়ার, গামা, ভুড়া ঘাসের জমি ও সবজিক্ষেত বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এদিন উল্টাডাব গ্রামে গিয়ে দেখা যায় কৃষকরা ডুবে যাওয়া জমি থেকে নেপিয়ার, গামা ও ভুড়া ঘাস কেটে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে আরকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাট ও ধঞ্চের জমি ও রূপসী গ্রামের সবজির জমি বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এতে কৃষকের চরম ক্ষতি হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও নাজমুল ইসলাম বলেন, বুধবারের চেয়ে বৃহস্পতিবার সারা দিনে যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ হার্ট পয়েন্ট এলাকায় ১৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পানি বৃদ্ধি আরও দুয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত