মাদক কারবারে পুলিশও!

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৩, ০১:৩২ এএম

মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনী শক্ত অবস্থান নেওয়ার কথা জানালেও বাহিনীর সদস্যরাই জড়িয়ে পড়ছেন মাদক কারবারে। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য দিয়ে নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগও আছে। আবার অনেক সদস্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এ কারণে চাকরি হারিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত থাকা ১২১ সদস্য।

পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, পথভ্রষ্ট কিছু সদস্যের মাদকাসক্ত হয়ে পড়া ও অবৈধ এই কারবারে জড়িয়ে পড়ার দায় গিয়ে পড়ছে পুরো বাহিনীর ওপর। তবে দেরিতে হলেও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। মাদক-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলে চাকরি করার সুযোগ থাকছে না পুলিশ বাহিনীতে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. মনজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে সব সময় আমাদের জিরো টলারেন্স। পুলিশের মধ্যে এ রকম যারা আছে (মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারে জড়িত) তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। আগেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে।’

পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুলিশ যারা চালাচ্ছেন তাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সার্বক্ষণিক মনিটর করতে হবে। পুলিশকে তিন থেকে চার মাস পরপর একটা কোর্স করাতে হবে। যেখানে মাদক সেবন বা কারবারে জড়ালে শাস্তির ভয়াবহ দিকটা তুলে ধরতে হবে।

গত বছরের ২৯ অক্টোবর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৫০০ গ্রাম হেরোইনসহ নুর মোহাম্মদ ওরফে নবীউল ইসলাম নামে এক পুলিশ কনস্টেবলকে আটক করে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। তিনি রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) চন্দ্রিমা থানায় কর্মরত ছিলেন। এ ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। নবীউলকে আটকের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোদাগাড়ী পৌর এলাকার সারাংপুর পুলিশপাড়া থেকে আরও ৫০০ গ্রাম হেরোইনসহ তার দুই সহযোগীকে আটক করা হয়। একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় মাদক কারবারে জড়িত থাকায় পুলিশের এক উপপরিদর্শক (এসআই) ও দুই কনস্টেবলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা হলেন ভালুকা মডেল থানার এসআই মানস কুমার শিকদার, কনস্টেবল আবদুল মান্নান, কনস্টেবল মুসফিকুজ্জামান, স্থানীয় মাদক কারবারি আশিকুর রহমান নিরব ও খোকন শেখ। তাদের কাছ থেকে ৯৮৯টি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা মাদক কারবার করে আসছিল।

এ ছাড়া ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর ইয়াবা, গাঁজা ও মাদক বিক্রির টাকাসহ ছেনোয়ারা বেগম শানু ও তার ছেলে আবদুল খালেক খোকনকে আটক করে চট্টগ্রাম মহানগরের আকবর শাহ থানা-পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা দুই পুলিশ কর্মকর্তার জড়িত থাকার কথা জানান। এরপর মহানগর পুলিশ গত বছরের জানুয়ারিতে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বরখাস্ত করে। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা হলেন বাকলিয়া থানার এসআই ফখরুল ইসলাম ও আকবর শাহ থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. কামাল।

গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতে খলিলুর রহমান নামে এক পথচারীর পকেটে ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগে পুলিশের এক সদস্য ও তার দুই তথ্যদাতাকে (সোর্স) গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন পল্লবী থানার এএসআই মাহবুবুল আলম, সোর্স সোহেল রানা ও রুবেল হোসেন। এ ঘটনায় মাহবুবুল আলমকে বরখাস্ত করা হয়। মামলা তদন্ত করে তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

পুলিশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় ইউনিট ডিএমপি। ২০২০ সালের শুরুতে ডিএমপির সাত সদস্যের ডোপ টেস্ট হয়। তাদের বেশিরভাগই শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপরই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টনক নড়ে। মাদকবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর বিভিন্ন সূত্র থেকেও মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে তথ্য পায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এরপর রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ও রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক চক্রের ২১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মেলে। কারবারিদের সহযোগিতাকারী হিসেবে প্রথমে শিল্পাঞ্চল থানার এক এএসআইয়ের নাম আসে।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, এমন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ১০ মার্চ তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার পুলিশকে মাদকমুক্ত করতে ডোপ টেস্ট (মাদকাসক্তি শনাক্তের পরীক্ষা) চালু করেন। এরপর থেকে পরীক্ষায় ধরা পড়া সদস্যদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে।

ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের যেসব সদস্য মাদকে জড়িয়ে পড়েছে তাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান। এখন পর্যন্ত ১২৬ জন শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে চাকরিচ্যুত হয়েছে ১২১ জন। এ ছাড়া পাঁচজনের বিষয়ে এখনো তদন্ত চলমান।’

এদিকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাদকের অপব্যবহার এবং মাদক কারবারে জড়িত থাকার বিষয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পুলিশ সপ্তাহ ২০২৩ চলাকালে এক অপরাধ সম্মেলনেও পুলিশের মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পুলিশের শীর্ষ কর্তারা। রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামেও ওই সম্মেলনে উপমহাপরিদর্শক ও পুলিশ সুপারসহ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. নূরুল আনোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিকাংশ পুলিশ ভালো, তবে মাঠপর্যায়ে যারা থানা, ফাঁড়ি ও চেকপোস্টে থাকে এমন কিছু পুলিশ অপরাধে জড়ায়। এক হাজার পিস ইয়াবা বিক্রি করলে অনেক টাকার মালিক হবেÑ এমন লোভ তারা সংবরণ করতে পারে না। যেটা বেদনাদায়ক, এমন হওয়া উচিত না।’

এমন পরিস্থিতির জন্য পুলিশের সাবেক এই আইজি পারিপাশির্^কতাকেও দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের চারপাশে ঘুষ, দুর্নীতি ছেয়ে গেছে। এমন কোনো পেশা নেই যেখানে এসব নেই। পুলিশও মানুষ, তারাও অনেক সময় বিভ্রান্ত হতে পারে। তবে সেটা দমিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত