রেলে ঢাকায় আসতে আরও অপেক্ষা মাগুরাবাসীর

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৩, ১২:৪৫ এএম

মাগুরার প্রাচীন রেলওয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমলে, ১৮৭২ সালে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর সংস্কার হয়নি। প্রায় ৪৭ বছর পর মাগুরা জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে ২০১৮ সালে ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় এ জেলাকে ঢাকার রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত করার স্বপ্ন ফিকে হতে চলেছে মাগুরাবাসীর।

প্রকল্পটির প্রথম মেয়াদের চার বছরেও জমি অধিগ্রহণ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান। এমনকি পরবর্তী সময়ে দুই বছর বাড়ানো হলেও সেই মেয়াদও প্রায় শেষের দিকে। প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার ৫ বছরেও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সম্প্রতি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) করা নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

‘মধুখালী থেকে কামারখালী হয়ে মাগুরা শহর ব্রডগেজ নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাগুরা জেলায় প্রায় ১১ কিলোমিটার রেললাইন তৈরি করার জন্য ১১২ একর ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রমে তেমন অগ্রগতি নেই। প্রকল্পটি গ্রহণের সময় জমি অধিগ্রহণের অদূরদর্শিতার প্রমাণও স্পষ্ট হয়েছে। বাস্তবে প্রায় ২৪ কিলোমিটারের রেললাইনের জন্য ১১২ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এতে ব্যয় হবে ১৯৫ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্প প্রস্তাবে এ খাতের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা।

মূলত জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণেই প্রকল্পটির কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। জমি অধিগ্রহণ দেরিতে হওয়ার কারণ হিসেবে রেলওয়ে বলছে, জমি অধিগ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে মাগুরা জেলা প্রশাসককে ১৫৫ কোটি টাকা এবং ফরিদপুর জেলা প্রশাসককে ৪০ কোটি টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী ফরিদপুর ডিসিকে আরও ৪০ কোটি ৩০ লাখ টাকা দিতে হবে। কিন্তু ডিপিপিতে জমি অধিগ্রহণের জন্য আর কোনো টাকা বরাদ্দ নেই। এখন প্রকল্প সংশোধন ছাড়া ফরিদপুরের ডিসিকে টাকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে বলছে, ডিপিপিতে ব্যয়ের হিসাব ঠিকমতো করা হয়নি। এতে ডিপিপির গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ২৯ মে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয় এবং বাস্তবায়নকাল ১ মে ২০১৮ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০২৪ নির্ধারিত হয়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্যান্য প্রকল্পের মতো কভিড ১৯-এর কারণে এ প্রকল্প কার্যক্রমেও বিঘœ সৃষ্টি করে। কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের কর্মস্থল ও প্রকল্প সাইট থেকে বহুদিন দূরে থাকতে হয়েছে, যা প্রকল্পের অগ্রগতি ও কার্যক্রমে বিঘœ সৃষ্টি করেছে।

প্রকল্পটি ধীরগতির কারণ হিসেবে তারা আরও বলছেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দ্রব্যের দাম সমন্বয়ের জন্য কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে কাজের অগ্রগতি খুবই মন্থর। মূল ডিপিপিতে চন্দনা ব্রিজের স্প্যান ছিল তিনটি এবং পরিমাপ ছিল ৯০ মিটার, যা নির্মাণ-সংক্রান্ত সম্ভাব্যতা যাচাই করে তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে সেই ডিজাইন অনুসারে ব্রিজ নির্মাণ করতে গেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ডিজাইন পরিবর্তন করে ১২০ মিটার করা প্রয়োজন পড়ে। এখন অসুবিধা হলো ব্রিজটির কাজ সম্পন্ন করতে ব্যয় ও সময় উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। সম্ভাব্যতা যাচাই করার সময় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে করা হয়নি।

প্রকল্প অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত মোট আর্থিক অগ্রগতি ৪৩৪ কোটি টাকা। বাস্তব (ভৌত) অগ্রগতি ৪০ শতাংশ। সময় অতিক্রান্ত বিবেচনায় প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতির তুলনায় আর্থিক অগ্রগতি পিছিয়ে আছে।

ভূমি অধিগ্রহণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও ছাড় করে ভূমি অধিগ্রহণ ত্বরান্বিত করা আবশ্যক। এছাড়া রেল, ব্রিজের গার্ডার এখনো সংগ্রহ করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের নিয়মিত পিআইসি ও পিএসসি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। 

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কিছু ঝুঁকিও চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নির্মাণ সামগ্রীর ব্যয় বাড়ার কারণে প্রকল্পের কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ আবারও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া চন্দনা নদীতে ব্রিজ ফাউন্ডেশনে সমস্যা হচ্ছে যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

বাংলায় প্রথম দর্শনা থেকে জগতি পর্যন্ত ৫৩ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপিত হয় ১৮৬২ সালে। পরবর্তী সময়ে ১৯৩২ সালের জানুয়ারি মাসে মধুখালী থেকে কামারখালী ঘাট পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ এ শাখা লাইনটি বন্ধ হয়ে যায়।

প্রকল্পের কার্যক্রম মূলত ২টি প্যাকেজে বাস্তবায়িত হচ্ছে। মে ২০২৩ পর্যন্ত প্যাকেজ ২টির ভৌত অগ্রগতি ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। মে ২০২৩ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ভৌত অগ্রগতি ৪০ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।

নির্মাণকালে প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের প্রাক্কলন ব্যয় বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হচ্ছে। আইএমইডি বলছে, নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশন মেনে, প্রকল্পের জন্য সংগ্রহ করা মালামাল বা উপকরণের গুণগতমান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া ও নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রকল্পের নির্মাণাধীন কয়েকটি মূল উপাদান রয়েছে, যেগুলো হচ্ছে- একটি ১৯ দশমিক ৯০ কিলোমিটার ব্রডগেজ ট্র্যাক নির্মাণ; একটি ৪.৯ কিমি লুপ লাইনের উন্নয়ন; চন্দনা সেতু (৯০ মিটার) এবং গড়াই সেতু (৫৪৯ মিটার) বিস্তৃত দুটি বড় সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত